মথার উত্থান প্রভাব ফেলবে পূর্বোত্তরে
পান্নালাল রায়
April 20, 2026
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের ধারণা অনুযায়ী ত্রিপুরার উপজাতি স্বশাসিত জেলা পরিষদে দ্বিতীয় বারের মতো ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন ঘটেছে তিপ্রা মথার। তবে যেটা ধারণার বাইরে ছিল সেটা হচ্ছে বিজেপি সহ জাতীয় দলগুলোর এমন শোচনীয় ফলাফল এবং আঞ্চলিক দল মথার ধারণাতীত বিপুল উত্থান। ত্রিপুরায় আঞ্চলিক দলের এই প্রবল উত্থান আগামী দিনে উত্তর পূর্বাঞ্চলের স্হানীয় রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দেশের পাঁচটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনী ডামাডোলে স্বাভাবিক ভাবেই চাপা পড়ে গিয়েছিল ত্রিপুরার এই উপজাতি স্বশাসিত জেলাপরিষদ অর্থাৎ এডিসি নির্বাচন প্রসঙ্গ। কিন্তু বিধানসভা নির্বাচন চলাকালীন ত্রিপুরার এই নির্বাচনে বিজেপি'র জোর ধাক্কা খাবার পর এখন অনেকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করছে ত্রিপুরা।এমনকি পশ্চিমবঙ্গের ভোট প্রচারেও স্বাভাবিক ভাবেই উঠে এসেছে ত্রিপুরায় বিজেপি'র ভোট বিপর্যয়।ত্রিপুরার এডিসি'র ভোট আরও আকর্ষণীয় ছিল এই কারণে যে রাজ্যে যে দু'টি দল সরকারে রয়েছে,এডিসি ভোটে সেই বিজেপি ও তিপ্রা মথা ছিল পরস্পরের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী।ত্রিপুরায় রাজ্য রাজনীতির পক্ষে এডিসি'র ভোট খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রাজ্য বিধানসভার মোট ৬০টি আসনের ২০ টি উপজাতি সংরক্ষিত আসন রয়েছে জেলাপরিষদ জুড়ে।তাই জেলাপরিষদে যাদের আধিপত্য থাকবে তাদের পক্ষে রাজ্যের ক্ষমতা দখল অনেকটাই সহজ হয়ে পড়ে।একসময় রাজ্যের এই সংরক্ষিত আসন সমূহে একাধিপত্য ছিল সিপিএমের। দশকের পর দশক রাজ্যে তাদের ক্ষমতায় থাকার ব্যাপারে এই আসনগুলো বিরাট ভূমিকা পালন করেছে।সাড়ে চার দশক আগে ত্রিপুরাতে এডিসি গঠনের পর বেশিরভাগ সময়ই সিপিএমের দখলে ছিল তা।কিন্তু ২০১৮ সালের পর এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটে।রাজ্যে ক্ষমতাচ্যুত হয় বামফ্রন্ট। উপজাতি আসনগুলোতেও তারা শোচনীয় ব্যর্থ হয়।পরবর্তী সময়ে এডিসি থেকেও তারা ক্ষমতাচ্যুত হয়।২০২১ সালের ভোটে এডিসি'র ক্ষমতায় আসে তিপ্রা মথা।
২০২৩ সালের ত্রিপুরা বিধানসভা ভোটের আগে 'গ্রেটার তিপ্রাল্যান্ডে'র মতো এক স্পর্শকাতর দাবি তুলে রাজ্যের জনজাতি অধ্যুষিত এলাকায় তিপ্রা মথা এক প্রবল আবেগের সঞ্চার করেছিল জনজাতিদের মধ্যে।বিধানসভার ভোটেও তারা অভূতপূর্ব সাফল্য পায়।মোট ১৩টি আসন লাভ করে মথা বিধানসভায় প্রধান বিরোধীদলের মর্যাদা পায়।যদিও মথা নেতৃত্বের ধারণা ছিল রাজ্যে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে তারা এক নির্ণায়ক ভূমিকা নেবে,কিন্তু তা আর হয়ে উঠে না।বিজেপি-ই টেনেটুনে সরকার গঠনে সমর্থ হয়।অবশ্য নির্বাচনে বিজেপি'র ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের চেয়েও চমকপ্রদ ঘটনাটি ঘটে কিছুদিন পর।বিজেপি'র শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে মথার আলোচনার পর এক ত্রিপাক্ষিক চুক্তির কথা ঘোষিত হয় এবং কেন্দ্র,রাজ্য ও মথার মধ্যে এই ত্রিপাক্ষিক চুক্তি সম্পাদনের সূত্রে তিপ্রা মথা বিজেপি জোট সরকারে যোগ দেয়।নজিরবিহীন ভাবে বিরোধীদল নেতা তিপ্রা মথার বিধায়ক অনিমেষ দেববর্মা মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। রাজ্যের জনজাতি সম্প্রদায়ের মধ্যে তখন একচ্ছত্র আধিপত্য মথার। এডিসি'র ক্ষমতায় আছে তারা,আবার আছে রাজ্য মন্ত্রিসভাতেও।কিন্তু এ অবস্থায়ও সাংগঠনিক তৎপরতা বৃদ্ধি সহ আন্দোলনের পথ থেকে তারা সরে আসেনি।বিশেষত ককবরক ভাষার জন্য রোমান লিপি সহ ত্রিপাক্ষিক চুক্তি রূপায়নের দাবিতে প্রায়ই তাদের মাঠে ময়দানে নামতে দেখা যায়।ত্রিপুরার জনজাতিদের যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে মথার প্রভাব দিন দিন বাড়তেই থাকে।যদিও জেলাপরিষদের ক্ষমতায় থেকে তেমন কোনও সুযোগ সুবিধা জনজাতিদের দিতে পারেনি মথা,তবু,এই অভিযোগকে তারা রাজ্য সরকারের দিকেই ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম হয়।রাজ্য সরকার তেমন সহায়তা করছে না,প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ হচ্ছে না, তারা এমন অভিযোগ জানাতে থাকে।এবারের এডিসি ভোটের আগেও তিপ্রা মথার সঙ্গে বিজেপি'র সম্পর্কের বিষয়ে এ ধরণের অভিযোগ পাল্টা অভিযোগের প্রভাব পড়ে।ভোটের কয়েক মাস আগে থেকেই বাজার গরম হয়ে উঠে।মথা বিজেপি জোট সরকার থেকে বেরিয়ে আসার হুমকি দেয়,বিজেপি-ও দেয় পাল্টা হুমকি।বেরিয়ে গেলে বেরিয়ে যাও,কেউ ধরে রাখছে না তোমাদের। মাঠে ময়দানের সভা সমাবেশের কাজিয়া কিছু কিছু ক্ষেত্রে হিংসাত্মক ঘটনায় পরিণত হয়।রাজনৈতিক দলের সাধারণ কর্মী সমর্থকরাই এ ধরণের ঘটনার শিকার হন।মাঠে ময়দানের অভিযোগ পাল্টা অভিযোগের ক্ষেত্রে শেষপর্যন্ত মুখ্য হয়ে পড়ে দুই মুখ, মুখ্যমন্ত্রী ডাঃমানিক সাহা এবং তিপ্রা মথা প্রদ্যোত কিশোর। মুখ্যমন্ত্রী মথা পরিচালিত এডিসি'র প্রশাসনে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ করেন। আবার মথা সুপ্রিমো প্রদ্যোত কিশোর উপজাতিদের অধিকার ও উন্নয়ন ইস্যুকে সামনে এনে রাজনৈতিক বার্তা দেন। তিনি বলেন, ভোটের পরই রাজ্য রাজনীতিতে পরিবর্তন হবে।কিন্তু এরকম পাল্টাপাল্টি ভাষণ বক্তৃতার পরও এডিসি'র ভোটের আসন সমঝোতা নিয়ে দিল্লিতে আলোচনা চলতে থাকে।মুখ্যমন্ত্রীও সে কথা জানিয়ে দেন। কিন্তু শেষপর্যন্ত সমঝোতার প্রয়াস ব্যর্থ হয়।আসন সংখ্যার দাবিতে দু'পক্ষ অনড় থাকায় আর নির্বাচনী সমঝোতা হয় না।দুপক্ষই জেলাপরিষদের ২৮ টি আসনে প্রার্থী দেবার কথা ঘোষণা করে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
এবার এডিসি'র নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণার পর দেখা যাচ্ছে সমঝোতার আলোচনার আগে দু'পক্ষের জল মাপার ক্ষেত্রে নিশ্চিত এক পক্ষের শোচনীয় ব্যর্থতা ছিল।বিজেপি-যে এডিসি'র ভোটে এমন ভাবে ব্যর্থ হবে তা হয়তো তারা কল্পনাই করতে পারেনি।বিজেপি'র জনজাতি নেতা থেকে মুখ্যমন্ত্রী সহ বিজেপি'র রাজ্য নেতৃত্ব এমন ধারণা ব্যক্ত করেছিলেন যে তারাই এডিসি'র ক্ষমতায় আসছে।এমনকি রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলের মনেও এক ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছিল। তিপ্রা মথার সুপ্রিমো প্রদ্যোত কিশোরের সভায় জনতার ঢল,অথচ বিজেপি'র সবাই জয়ের ব্যাপারে দৃঢ় ভাবে আশাবাদী!মথা সুপ্রিমো অবশ্য বলছিলেন বিজেপি শোচনীয় ভাবে হারবে।এরপর মুখ্যমন্ত্রীর পদে ডাঃমানিক সাহা থাকবেন কিনা তা অনিশ্চিত। নির্বাচনী প্রচারে সংঘটিত হিংসাত্মক ঘটনার ব্যাপারে একনাগাড়ে শুধু মথার বিরুদ্ধেই বিজেপি অভিযোগ জানিয়ে যাচ্ছিল। তাই বিজেপি'র জয়ের দাবি কতটা বাস্তবের উপর ভিত্তি করে ছিল তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।নির্বাচনে ব্যর্থতার পর এখন স্বাভাবিক ভাবেই নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে দলীয় কর্মী-সমর্থকদের মধ্যেই প্রশ্ন উঠছে।
জেলাপরিষদের ২৮টি আসনের মধ্যে তিপ্রা মথা এবার ২৪ টি আসন লাভ করেছে।বিজেপি পেয়েছে ৪টি আসন।সিপিএম, কংগ্রেস, আইপিএফটি শূন্য। ভোট শতাংশের হারেও মথা বিজেপি সহ অন্য দলগুলোর চেয়ে অনেক অনেক উপরে।তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ২০২১ সালের ভোটের চেয়েও তিপ্রা মথা এবারের এডিসি'র ভোটে অনেক ভাল ফল করেছে।খারাপ হয়েছে বিজেপি'র। গত ভোটে মথা পেয়েছিল ১৮ টি আসন এবং বিজেপি ৯ টি। পাঁচ বছর এডিসি'র ক্ষমতায় থেকেও মথার এবারের দুর্দান্ত জয় ওয়াকিবহাল মহলের মনে কিছু প্রশ্ন তুলে ধরেছে।প্রদ্যোত কিশোর যা চাইছিলেন এবার হয়তো তা পূরণ হতে চলেছে।রাজ্যে সরকার গঠনে এক নির্ণায়ক ভূমিকা নিতে চেয়েছিলেন তিনি।রাজ্যের জনজাতি অধ্যুষিত এলাকায় যে ব্যাপক ভাবে মথার প্রভাব বাড়ছে তাতে মনে হচ্ছে এটা সময়ের অপেক্ষা মাত্র। এডিসি'র জয়ের পর মথা সুপ্রিমো প্রদ্যোত কিশোর ও তাঁর দল এখন রাজ্য রাজনীতির নির্ণায়ক শক্তি।হয়তো আগামী দিনে ত্রিপুরার রাজনৈতিক সমীকরণ পাল্টে যাবে।
এডিসি ভোটে কংগ্রেস ও সিপিএম শোচনীয় ভাবে ব্যর্থ শুধু নয়,জনজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলের রাজনীতিতে যেন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছে তারা।ত্রিপুরার বিরোধী দলনেতা জিতেন চৌধুরী বলেছেন,গত পাঁচ বছরে মথা এডিসি প্রশাসনে থাকলেও কোনও সাফল্য নেই। সর্বক্ষেত্রে জনজাতিরা ছিলেন বঞ্চিত। শুধু একটি আবেগকে পুঁজি করে পুনরায় ক্ষমতায় এসেছে মথা।আবেগকে এই পর্যায়ে তোলার জন্য সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছেন মুখ্যমন্ত্রী।শ্রী চৌধুরী বলেছেন, জনজাতি আবেগকে নিপুণ ভাবে নির্বাচনে ব্যবহার করেছে মথা।কংগ্রেস বলেছে,এডিসি'র নির্বাচনে বিজেপি ও মথার মধ্যে গোপন সমঝোতা হয়েছিল। মূল উদ্দেশ্য জনজাতি এলাকায় কংগ্রেস ও সিপিএম-কে দুর্বল রাখা। কংগ্রেসের অভিযোগ এডিসি'র নির্বাচনে সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা হয়েছে।দলের মুখপাত্রের বক্তব্য, তিপ্রা মথার 'উগ্র বাঙালি বিদ্বেষী' মনোভাব এবং মুখ্যমন্ত্রীর 'বাঙালি আবেগ'কে উস্কে দেয়ার বক্তব্য ছিল এক কৌশলের অংশ।মথা সুপ্রিমো বলেছেন, বিজেপি'র একাংশ নেতাদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ নীতি ও অহংকারেই এডিসি-তে তাদের পতন ঘটেছে।তিনি বলেছেন,বিজেপি'র নেতারা উপজাতি জনসমাজকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছেন। মুখ্যমন্ত্রী সব বিজয়ীদের অভিনন্দন জানিয়ে ভোটে দলের ভরাডুবিকে একটি শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করার কথা বলেছেন।
নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণার পর বিভিন্ন দলের পক্ষে যে বক্তব্যই রাখা হোক না কেন, আসল কথা হচ্ছে ত্রিপুরার রাজনীতিতে এক বৃহৎ শক্তি হিসেবে তিপ্রা মথাকে মেনে নিতে হবে।রাজ্যের ২০২৮ সালের বিধানসভার ভোটের আরও অনেক দেরি।এর মধ্যে অনেক ভাঙাগড়া হতে পারে।তবে আগামীতে ত্রিপুরায় সরকার গঠনের ক্ষেত্রে মথা যে এক নির্ণায়ক ভূমিকা নিতে চলেছে তা যেন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।এডিসি'র ভোটের প্রচারে মথা সুপ্রিমো রাজ্যের আগামী বিধানসভার নির্বাচনের পর উপজাতি মুখ্যমন্ত্রীর দাবি তুলেছিলেন। ফলাফল ঘোষণার পর মথার বিশিষ্ট নেতা বিধায়ক রঞ্জিত দেববর্মাও ২০২৮ সালের বিধানসভা ভোটের পর উপজাতি মুখ্যমন্ত্রীর কথা বলেছেন দলের এক বিজয় সমাবেশে। মথা কোন লক্ষ্যে অগ্রসর হচ্ছে তা না বোঝার কোনও কারণ নেই। এদিকে মথা সুপ্রিমো প্রদ্যোত কিশোর হুমকি দিয়েছেন ত্রিপাক্ষিক চুক্তি রূপায়িত না হলে তারা সরকার থেকে বেরিয়ে যাবেন।
যাইহোক, এডিসি-তে তিপ্রা মথার বিপুল বিজয় এই অঞ্চলের স্হানীয় রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলবে।উত্তর পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন আঞ্চলিক দল মথার বিজয়ে উৎসাহিত হবে।বেশ কিছুদিন আগে উত্তর পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন রাজ্যের আঞ্চলিক দল সমূহকে নিয়ে ওয়ান নর্থ ইস্ট নামে একটি মঞ্চ গঠনে মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে নেতৃত্বের ভূমিকায় ছিলেন মথা সুপ্রিমো প্রদ্যোত কিশোর। আগামী দিনে এ ধরণের প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে আরও গতি লাভ করবে।
আরও পড়ুন...