এডিসি-র ভোটে বিজেপি-র এই ভরাডুবির পেছনে দায়ী কে?
জয়ন্ত দেবনাথ
April 17, 2026

ত্রিপুরা ট্রাইবাল এরিয়া অটোনোমাস ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল (টিটিএএডিসি)-এর ২০২৬ সালের নির্বাচনে তিপ্রামথা দল ২৮ আসনের মধ্যে ২৪ আসনে জয় নিশ্চিত করল। তিপ্রামথার এই বিপুল সংখ্যক আসনে জয় শুধু একটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী সাফল্য নয়, বরং এটি ত্রিপুরার রাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে। এই ফলাফল বিশেষ করে ২০২৮ সালের বিধানসভা নির্বাচনের নিরিখে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অপরদিকে বিজেপি-র মাত্র ৪ আসনে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়া স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিয়েছে যে পাহাড়ে তাদের জনভিত্তি মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
প্রথমত, এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় বার্তা হলো- পাহাড়ের ভোটাররা এবার সংগঠিত ভাবে আঞ্চলিক শক্তির পক্ষে রায় দিয়েছে। প্রদুত কিশোর দেববর্মন-এর নেতৃত্বে তিপ্রামথা উপজাতি সমাজের একক রাজনৈতিক অভিব্যক্তিতে পরিণত হয়েছে। এই ঐক্যবদ্ধ ভোট ভিত্তিই তাদের নিরঙ্কুশ জয়ের প্রধান ভিত্তি।
দ্বিতীয়ত, বিজেপির এই ভরাডুবির পেছনে বহুলাংশে দায়ী দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। মুখ্যমন্ত্রী ডা মানিক সাহা-কে দুর্বল করার লক্ষ্যে দলের একাংশের নিষ্ক্রিয়তা, এমনকি নেপথ্যে ভিন্নমুখী ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে যে কিছু নেতা, মন্ত্রী, বিধায়ক এবং সাংসদ নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য দলের সামগ্রিক স্বার্থকে উপেক্ষা করেছেন। এদের অনেকেই তাই মন লাগিয়ে এডিসি-র ভোটের প্রচারে অংশগ্রহণ করেন নাই। আর এই অন্তর্ঘাতই বিজেপির সাংগঠনিক ভিতকে দুর্বল করে দিয়েছে।ই।

তৃতীয়ত, বিজেপির সাংগঠনিক দুর্বলতা ও তৃণমূল স্তরের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা এই ফলাফলের অন্যতম কারণ। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পরেও শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য স্থানীয় নেতৃত্ব তৈরি করতে ব্যর্থ হওয়া, পুরনো ও নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের অবমূল্যায়ন করা, এবং দলীয় শীর্ষ নেতৃত্বের একাংশের একঘেয়েমি মনোভাব, সব মিলিয়ে সংগঠনের প্রাণশক্তি কমে গেছে। এমনকি অভিযোগ রয়েছে যে অনেক ক্ষেত্রে কর্মীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের পরিবর্তে চাপ সৃষ্টি করে জন সমাগম দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে, যা বাস্তবে দলের দুর্বলতাকেই সামনে এনেছে।

চতুর্থত, সিপিএম কিছু ক্ষেত্রে ভোট বাড়ালেও তা আসনে রূপান্তর করতে পারেনি। বরং তাদের ভোট বৃদ্ধির ফলে বিজেপির ভোট ভিত্তিতে ভাঙন দেখা গেছে, যার সরাসরি সুবিধা পেয়েছে তিপ্রামথা। ফলে বহু আসনে তিপ্রামথার জয় আরও সহজ হয়েছে।
অন্যদিকে কংগ্রেস এবং আইপিএফটি-এর সম্পূর্ণ ভরাডুবি প্রমাণ করে যে পাহাড়ে এখন মূল লড়াই কার্যত দ্বিমুখী হয়ে পড়েছে।
পঞ্চমত, এই নির্বাচনের ফলাফল ভবিষ্যতের রাজনৈতিক জোট সমীকরণকেও জটিল করে তুলেছে। তিপ্রামথা অতীতে বিজেপি-র সঙ্গে সমঝোতায় গেলেও, এই জয়ের ভিত্তি তৈরি হয়েছে বিজেপি-বিরোধী মনোভাবের উপর। তাই আগামী দিনে আবার যদি দুই দলের মধ্যে জোটের চেষ্টা হয়, তাহলে তা কর্মী ও সমর্থকদের কাছে গ্রহণযোগ্য করা ততটা সহজ হবে না। এটি তিপ্রামথা নেতৃত্বের জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
ষষ্ঠত, এই ফলাফল বিজেপির জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। যদি দল এখনই অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসন, সংগঠনকে শক্তিশালী করা এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে পুনরায় সংযোগ স্থাপন করতে না পারে, তাহলে আসন্ন এডিসি-র ভিলেজ কাউন্সিল ও ২০২৮ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে। রাজনৈতিক মহলের মতে, এটি শুধুমাত্র বিজেপি-র একটি পরাজয় নয়, বরং ভবিষ্যতের বড় বিপদের পূর্বাভাস।
সবশেষে বলা যায়, তিপ্রামথার এই জয় ত্রিপুরার রাজনীতিতে আঞ্চলিক শক্তির উত্থানকে ফের একবার সুদৃঢ় করেছে এবং জাতীয় দল গুলির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। পাহাড়ের এই রায় থেকে এটাও স্পষ্ট যে এখন থেকে ত্রিপুরার পাহাড়ের রাজনীতি হবে জাত পরিচয়, আবেগ, অধিকার, স্থানীয় লাভালাভ ও জাত নেতৃত্বকে কেন্দ্র করে। ২০২৮-এর পথে এই ফলাফলই হয়ে উঠতে পারে ত্রিপুরার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ভিত্তি। যার কেন্দ্র ভূমিতে থাকবেন ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সদস্য ও তিপ্রামথার ফাউন্ডার প্রদুত কিশোর দেববর্মন।
( লেখক জয়ন্ত দেবনাথ একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও ত্রিপুরাইনফো-র সম্পাদক)
আরও পড়ুন...