থানা হাজতে পিতা - পুত্রের নৃশংস হত্যা , নয় পুলিশকর্মীর ব্যতিক্রমী সাজা
পুরুষোত্তম রায় বর্মন
April 12, 2026
হাজত হত্যার দায়ে নয় জন পুলিশ কর্মীর মৃত্যুদন্ড প্রদান করেছে মাদুরাইয়ের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা বিচারক। পুলিশের নির্মম অত্যাচারে নিহত বাবা -ছেলে জয়রাজ ও বেনিক্স এর পরিবারকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে এক কোটি চল্লিশ লক্ষ টাকা প্রদান করতে হবে সাজাপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মীদের জরিমানা হিসেবে। হাজত হিংসা ও এনকাউন্টার ডেথ প্রচন্ডভাবে ক্রমবর্ধমান এবং প্রতিকারহীন। এটাই নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাষ্ট্র ও সরকার নাগরিকদের উপর নিষ্ঠুরতার নতুন ধারাভাষ্য তৈরি করছে। এটাই নিয়ম । প্রতিকার পাওয়া পৃথিবী থেকে চাঁদে হেঁটে পৌঁছার চাইতেও দুরূহ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হাজত হিংসা ও এনকাউন্টার ডেথের ক্ষেত্রে আদালত ও বিভিন্ন মানবাধিকার কমিশনগুলো দায়িত্ব পালন করছে না। এই প্রেক্ষাপটে মাদুরাই আদালতের রায় এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম নিঃসন্দেহে। হাজত হিংসা ও হাজত হত্যা প্রতিরোধে এবং দোষীদের সাজা নিশ্চিত করার কঠিনতম চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার ক্ষেত্রে এই রায় অনুপ্রেরণাকারী দৃষ্টান্ত।
তখন সারাদেশে কোভিড। ২০২০ সনের উনিশে জুন । জয়রাম ও বেনিক্স এর মোবাইল ফোন সারাই ও বিক্রির দোকান তামিলনাড়ুর তুতিকোরিনে। লকডাউনের সময় দোকান খোলা রাখার তথাকথিত অভিযোগে সাতানকুলাম থানার পুলিশ জয়রাজকে (বয়স ৫৫ বছর ) থানায় তুলে নিয়ে যায়। বাবাকে থানায় নিয়ে গেছে শুনে ছেলে বেনিক্স থানায় যায়। জানতে চায় কেন বাবাকে থানায় তুলে নিয়ে গেছে। থানা বাবুদের প্রশ্ন করার অপরাধে বাবা - ছেলের উপর শুরু হয় নির্মম অত্যাচার। সারারাত ধরে চলে অত্যাচার। মৃত প্রায় বাবা - ছেলেকে সকালে পাঠানো হয় হাসপাতালে। ২২ শে জুন মারা যান বেনিক্স , ২৩ শে জুন জয়রাজ। পুলিশের দাবি জয়রাজ ও বেনিক্স নিজেরাই নিজেদের জখম করেছেন। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট অন্য কথা বলে। থানা হাজতে নির্মম অত্যাচারের ফলেই বাবা-ছেলের মৃত্যু হয়েছে। প্রতিবাদের ঝড় উঠে মাদুরাই সহ তামিলনাড়ুতে। মাদ্রাজ হাইকোর্টের মাদুরাই বেঞ্চ স্বতঃ প্রণোদিতভাবে মামলা গ্রহণ করে। প্রমাণ লোপাট যাতে পুলিশ না করতে পারে তাই সাতানকুলাম থানা সিজ করা হয় । দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয় রেভিনিউ ইন্সপেক্টর এর হাতে। জনমতের চাপে পড়ে তামিলনাড়ু সরকার বাধ্য হয় তদন্তের ভার সিবিআই এর হাতে তুলে দিতে। মাদুরাই হাইকোর্টের তদারকিতে সিবিআই তদন্ত শুরু করে। ২০২০ সনের সেপ্টেম্বরে প্রথম চার্জশিট পেশ করে সিবিআই। অতিরিক্ত চার্জশিট পেশ করে ২০২৪ এ । হাইকোর্টের নির্দেশে দায়রা আদালত বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত গতিতে শুরু করে। থানার এক মহিলা সাব - ইন্সপেক্টর সাক্ষ্য দিয়ে জানান ,লকআপে নিগ্রহ করা হয়েছে বাবা ও ছেলেকে। থানার সিসিটিভি ফুটেজেও পুলিশের অত্যাচারের অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়। নয়জন সাজাপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মীদের মধ্যে রয়েছেন, ইন্সপেক্টর এস শ্রীধর, দুই সাব-ইন্সপেক্টর পি রঘু গনেশ ও কে বালা কৃষ্ণান, দুজন হেড কনস্টেবল এস মুরুগান ও এ সামমিদুরাই এবং চার কনস্টেবল মুথুরাজ, চেল্লা দুরাই, টমাস ফ্রান্সিস ও ভেলিমুথু। অভিযুক্ত এক স্পেশাল সাব ইন্সপেক্টর পালা দুরাই মামলা চলাকালীনই মারা যান।
হাজত হিংসা ও হাজত হত্যার ৯৯% ক্ষেত্রেই প্রমাণ লোপাট করা হয়। তদন্তের নামে যা করা হয় তা প্রহসনকেও হার মানায় । নাগরিক সমাজ, মানবাধিকার কমিশন ও বিচার ব্যবস্থা দায়িত্ব পালন করে না । তাই উর্দি পড়া অপরাধীরা ডাবল প্রমোশন পায় সাজার বদলে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের সংবর্ধনাও জোটে। সব শিয়ালের এক রা, হুক্কা হুয়া। কোন থানায় অভিযুক্তকে পিটিয়ে খুন করা হলো তখন অভিযুক্ত পুলিশ কর্মীকে বাঁচাতে সমগ্র পুলিশ, প্রশাসন ও সরকার মাঠে নেমে পড়ে। তথাকথিত সুনাম রক্ষার তাগিতে । চুলোয় যাক মানবাধিকার। চুলোয় যাক মানুষের জীবনের অধিকার। সংবিধান ও আইন থাকবে শুধুমাত্র সংবিধান ও আইনের পুস্তকে। মাদুরাইয়ের তুতিকোরিনের হাজত হিংসায় নিশংসভাবে নিহত জয়রাজ ও বেনিক্স এর খুনিরা সাজা পেল নিম্নোক্ত কারণগুলোতে :
ক. নাগরিক সমাজের প্রবল প্রতিবাদ ।
খ. তামিলনাড়ুর মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সক্রিয়তা ।
গ. প্রচার মাধ্যমের সদর্থক ভূমিকা ।
ঘ. মাদুরাই উচ্চ আদালতের স্বত: প্রণোদিত মামলা গ্রহণ ।
ঙ. মাদুরাই উচ্চ আদালতের নির্দেশে ঘটনার অব্যবহিত পরেই সাথানকুলাম থানা সিজ করে রেভিনিউ ইন্সপেক্টর এর হাতে থানার দায়িত্বভার তুলে দেওয়া ।
চ. প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা ও সিসিটিভি ফুটেজ মুছে দেওয়ার চেষ্টা বিফলে যাওয়া ।
ছ . সঠিক পোস্ট মটেম রিপোর্ট - সংশ্লিষ্ট ডাক্তার চিকিৎসকদের টাকা দিয়ে কেনা যায়নি ।
জ. উচ্চ আদালতের তদারকিতে সিবিআই তদন্ত, সুষ্ঠু তদন্ত শেষে চার্জশিট।
ঝ. সিবিআই কে দিয়ে সুবিধাজনক তদন্ত রিপোর্ট দেওয়া সম্ভব হয়নি।
ঞ. মৃতদের পরিবারের মুখ বন্ধ করা যায়নি ।
সব মিলিয়েই ব্যতিক্রম ঘটেছে।
এই রায় যারা হাজত হিংসা ও এনকাউন্টার ডেথের বিরুদ্ধে সুবিচারের জন্য যারা লড়ছেন তাদেরকে উৎসাহিত করবে।
মৃত্যুদণ্ড মানবাধিকার বিরোধী। তাই মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে আজীবন কারাবাস উপযুক্ত সাজা। ত্রিপুরা হিউম্যান রাইটস অর্গানাইজেশন ত্রিপুরা রাজ্যে হাজত হত্যা ও হাজত হিংসার বিরুদ্ধে লড়ছে। এই লড়াই জারি থাকবে।
আরও পড়ুন...