ত্রিপুরা এডিসি নির্বাচন ২০২৬ : অস্থির রাজনীতি ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

জয়ন্ত দেবনাথ

April 11, 2026

ত্রিপুরায় বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমশ এক জটিল ও উদ্বেগজনক মোড় নিচ্ছে, যেখানে আইন-শৃঙ্খলা, নির্বাচন এবং রাজনৈতিক সমীকরণ, সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক অনিশ্চিত পরিবেশ। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন রাজনৈতিক দল গুলোর আত্মসমালোচনা, দায়িত্ববোধ এবং সংযম।

ত্রিপুরা পুলিশ, যারা একসময় দেশের গর্ব হিসেবে পরিচিত ছিল এবং রাষ্ট্রপতি পদকে সম্মানিত হয়েছে, তাদের উপর সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক আক্রমণের ঘটনা রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলার অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। যারা আইন রক্ষা করেন, তাদের নিরাপত্তা যদি বিঘ্নিত হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাও যে হুমকির মুখে পড়বে এবং পড়েছে তা বলাই বাহুল্য। কেননা, এবারের এডিসি-র ভোটের প্রাক্কালে এপর্যন্ত কম করেও অর্ধ শতাধিক হামলা সন্ত্রাসের ঘটনাতে শতাধিক লোক আহত হয়েছেন। বহু ক্ষেত্রেই পুলিশের সামনেই হামলার ঘটনা অভিযোগ আছে। কিন্ত দুর্বল পুলিশী ব্যবস্থাপনার কারনে একাধিক ক্ষেত্রেই সমস্যা বেড়েছে। তাই প্রশ্ন উঠেছে, রাজনৈতিক স্বার্থে যদি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে দুর্বল করা হয়, তবে তার পরিণতি সমগ্র সমাজকেই বহন করতে হবে।

এই প্রেক্ষাপটে রাজ্যে অশান্তির বাতাবরণ তৈরির প্রবণতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। মতভেদ গণতন্ত্রের অংশ, কিন্তু তা যদি সহিংসতা বা আতঙ্কের রূপ নেয়, তাহলে তা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। রাজ্যবাসীর একাংশের প্রশ্ন, কেন এই অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা সৃষ্টি করা হচ্ছে এবং কাদের স্বার্থে এই পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে?

এরই মধ্যে ত্রিপুরা ট্রাইবাল এরিয়া অটোনোমাস ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিলের নির্বাচনকে ঘিরে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ ভোট মানে গণতন্ত্রের মহোৎসবের আগে রাজনৈতিক দল গুলোর মানুষের জন্য কৃত কর্তব্য পালন বিষয়ে এবারের এডিসি-র ভোটের নির্বাচনী প্রচারকালে যতটা না গঠনমূলক বক্তব্য শোনার গেছে তার চেয়ে বেশী ভাষনবাজী হযেছে ব্যক্তিগত কুৎসা ছড়াতে। এডিসি-র শাসন ক্ষমতা পেলে কোন দল মানুষের জন্য কি করবে তার উল্লেখ করে বিজেপি ছাড়া অন্য কোন দল ১০ এপ্রিল প্রচারের শেষ দিনে পর্যন্ত কোন 'ইলেকশন মেনিফেস্টো' প্রকাশ করতে পারেননি। তিপ্রামথার প্রচারে অগ্রাধিকার পেয়েছে তারা এডিসি-র শাসন ক্ষমতা পেলে বিজেপির মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে ডা মানিক সাহা থাকবেন না, আর বিজেপির প্রচারে উঠে এসেছে তিপ্রামথা হারলে তাদের দলটাই আর থাকবেনা। এডিসি-র ভোটের প্রচারে এবারের মত এমন কুত্সিত ব্যক্তি আক্রমণ আগে কখনও দেখা যায়নি।

২৮টি আসনের এই নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ৯ লক্ষ ৬২ হাজার ৬৯৭ জন, যার মধ্যে প্রায় ৯৭ হাজার নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছে। রাজ্য পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মোট ১,২৫৭টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৩১১টি অতি স্পর্শকাতর এবং ৬৯৩টি স্পর্শকাতর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যা স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে অর্ধেকেরও বেশি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে রাজ্য পুলিশের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় বাহিনীও মোতায়েন করা হয়েছে। ১০ এপ্রিল

নির্বাচনী প্রচার পর্ব শেষ হলেও তা সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়নি। বিশেষ করে তিপ্রামথা দলের কার্যকলাপ নিয়ে একাধিক স্থানে উত্তেজনা ছড়ানোর কথা সামনে এসেছে। এই ঘটনা গুলি নতুন নয় বলেই মনে করছেন অনেকেই, কারণ দলের একাংশ নেতৃত্বের অতীত রাজনৈতিক পটভূমি নিয়েও দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। ফলে আবারও সামনে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক, দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিজেপির কি এই ধরনের আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে জোট করা উচিত?

বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এই জোটের ফলে বিজেপির এম এল এ, এমপি, মন্ত্রী, নেতা ও কর্মীদের উপর আক্রমণের ঘটনা ঘটছে, যা অতীতেও আইপিএফটি-র ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছিল। সাধারণ মানুষের একাংশ মনে করছেন, শুধুমাত্র ভোটের রাজনীতির জন্য এই ধরনের শক্তিকে প্রশ্রয় দেওয়া হলে তা দীর্ঘমেয়াদে রাজ্যের স্থিতিশীলতার পক্ষে ক্ষতিকর হতে পারে। তাই বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে একটি সুস্পষ্ট ও নীতিগত অবস্থান গ্রহণের দাবি উঠছে।

অন্যদিকে, তিপ্রামথা দলের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও খুব একটা স্থিতিশীল নয়। দিল্লীতে আসন সমঝোতার দর কষাকষিতে হেরে গিয়ে দলের প্রতিষ্ঠাতা প্রদ্যোত কিশোর দেববর্মন এবারের নির্বাচনে এককভাবে লড়াই করার সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করেছেন। যদিও তিনি আদর্শের সঙ্গে আপস না করার কথা বলছেন, তবুও দলের ভেতরে অসন্তোষ, ভাঙন এবং নেতৃত্বের একক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন ক্রমশ বাড়ছে। ইতিমধ্যেই কয়েকজন নেতা দলত্যাগ করেছেন এবং আরও অনেকে এডিসি-র ভোটের পর অন্য দলে যোগদানের অপেক্ষায় রয়েছেন বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।

এবারের এডিসি-র নির্বাচনে বিজেপি ২৮টি আসনেই এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে এবং তিপ্রামথার দুর্বলতাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। অন্যদিকে সিপিএমও তাদের সংগঠন পুনর্গঠনের মাধ্যমে শক্তি বাড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে এবং দুর্নীতিকে প্রধান ইস্যু হিসেবে তুলে ধরে এডিসি-র বিস্তীর্ণ অঞ্চলে অতি সন্তর্পনে নিজেদের জমি পুনরুদ্ধারে দ্রুত এগোচ্ছে। কংগ্রেসও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে, যদিও এডিসি এলাকায় তাদের প্রভাব তুলনামূলক ভাবে কম।

সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচন একটি ত্রিমুখী কঠিন লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে, যেখানে ফলাফল পুরোপুরি অনিশ্চিত। ১৫টি আসন পেলেই সংখ্যা গরিষ্ঠতা নিশ্চিত হবে, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে কোন দল সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে তা এখনই এত সহজে বলা যাবেনা।

এই অবস্থায় সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা একটাই, নির্বাচন হোক শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ। স্টেট ইলেকশন কমিশন ও পুলিশ প্রশাসনের কাছে এটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ শেষ পর্যন্ত শুধু রাজনৈতিক দলগুলির জয়-পরাজয় নয়, এই নির্বাচন নির্ধারণ করবে ত্রিপুরার গণতান্ত্রিক কাঠামোর প্রতি মানুষের আস্থা কতটা অটুট থাকবে।

ত্রিপুরার বর্তমান পরিস্থিতি তাই এক স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে, রাজনীতি যদি দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতার পথে না চলে, তবে তার প্রভাব গোটা সমাজকেই ভোগ করতে হয়। এখন সময় এসেছে শান্তি, সংযম এবং সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির পথে ফিরে যাওয়ার, তাহলেই ত্রিপুরা আবার তার গৌরবময় অবস্থানে ফিরে যেতে পারবে।

(লেখক একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও ত্রিপুরাইনফো-র সম্পাদক)

আরও পড়ুন...


Post Your Comments Below

নিচে আপনি আপনার মন্তব্য বাংলাতেও লিখতে পারেন।

বিঃ দ্রঃ
আপনার মন্তব্য বা কমেন্ট ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষাতেই লিখতে পারেন। বাংলায় কোন মন্তব্য লিখতে হলে কোন ইউনিকোড বাংলা ফন্টেই লিখতে হবে যেমন আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড (Avro Keyboard)। আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ডের সাহায্যে মাক্রোসফট্ ওয়ার্ডে (Microsoft Word) টাইপ করে সেখান থেকে কপি করে কমেন্ট বা মন্তব্য বক্সে পেস্ট করতে পারেন। আপনার কম্পিউটারে আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড বাংলা সফ্টওয়ার না থাকলে নিম্নে দেয়া লিঙ্কে (Link) ক্লিক করে ফ্রিতে ডাওনলোড করে নিতে পারেন।

Free Download Avro Keyboard

Fields with * are mandatory





Posted comments

Till now no approved comments is available.