সাদাকালোর জগতে আবেগের সূক্ষ্মতা নিয়ে অনবদ্য কাজ পরবাসী
সান্নিধ্য দাশ
March 2, 2026
প্রেক্ষাপট
পরবাসী ছায়াছবি প্রাক্তন স্বাধীনতা সংগ্রামী নিমাই ও তার পরিবারের কাহিনী। ১৯৬০ এর দশকে গোটা পরিবার নিয়ে নিরাপত্তার খোঁজে নিমাই ভারতে চলে আসেন। যাত্রাপথে তাঁর মেয়ে অসীমা নিখোঁজ হয়ে যায়। এই ঘটনা কাহিনীর মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
অবশেষে তারা ত্রিপুরার একটি আদিবাসী গ্রামে আশ্রয় পায়। ধীরে ধীরে নিমাই স্থানীয় শিশুদের পড়াতে শুরু করেন এবং পরিবারটি নতুন জীবনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে থাকে। এদিকে নিমাইয়ের নিখোঁজ মেয়ে আশ্রয় পায় পূর্ব পাকিস্তানের এক বাড়িতে।
বিশ্লেষণ
পরিযায়ী ছায়াছবির দর্শনকে তিন ভাগে ভাগ করা যেতে পারে: প্রেম, ধর্ম ও "ইম্প্রেশন"। গল্পের চরিত্রদের অভিজ্ঞতার মধ্যে এই তিনিটি ভাবনা ফুটে ওঠে নানাভাবে। একটু বিশ্লেষণ করলে প্রতিটা আঙ্গিক আরও সরলভাবে ধরা দেয়।
প্রেম:
প্রেম মানুষকে মনুষত্ব দেয়। প্রাণিজগতে প্রেম শুধু প্রজনন বা খুব বেশি হলে প্রতিপালনের মধ্যে ফুটে ওঠে। মানুষ প্রেমকে আলাদা পর্যায়ে বসায়। মানবিক প্রেমকে গতে বাঁধা যায় না। মানুষ আপনজনকে যেমন ভালোবাসে, বাড়ির ব্যালকনির কোনাটাকেও ভালোবাসতে পারে। এই অহৈতুকী ভালোবাসা অত্যন্ত "humane"। দেশের প্রতি অনুরাগের পরিকল্পনাও এই দর্শন থেকেই জন্ম নিয়েছে। মানুষ যেখানে বেড়ে ওঠে, সে জায়গার সাথে এক নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ হয়। স্থাবর জঙ্গম যা কিছু তার সান্নিধ্যে থাকে, তার প্রতি একটা অমায়িক অনুরাগ তৈরী হওয়া মানুষ হয়ে ওঠার অংশ। বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনের পাশাপাশি, উঠোনের তুলসীগাছ, গোলাভরা ধান, ঘরের চৌকাঠ, সবকিছুর মধ্যেই প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে মানুষের আবেগ। সেগুলো ছেড়ে আসার মুহূর্তে যে ব্যথা বুককে চিরে দেয়, স্বাভাবিক শব্দে সে ব্যথা প্রকাশ করা সম্ভব নয়। মৌলবাদীদের জিঘাংসায় যারাই দেশছাড়া হয়েছে, শুধু তারাই একজন আরেকজনের সাথে ভাগ করতে পারে এই বিচিত্র ব্যথা। যে মুহূর্তে উদ্বাস্তু নিমাই ঘরের চৌকাঠ পার করবেন, তার স্ত্রী খুশীবালা বাড়ির একটা খুঁটি ধরে আলতোস্বরে কাঁদতে শুরু করেন। এই চাপাকান্না ট্রান্সলেট করা বড় মুশকিল।
ধর্ম:
“ধর্মর কাছে ইনসানিয়াত মাথা নুয়াইয়া দেয়…”
ধর্ম মানুষের সংজ্ঞায় তৈরী হয়। মানুষ তার পরিধি অনুযায়ী ধর্ম নির্ধারিত করেন। পরিস্হিতি ও প্রতিকূলতার মাঝে ধর্মের পরিধি সংকীর্ণ বা বিকশিত হয়। আবার প্রতিটা মানুষের একটা ব্যক্তিগত ধর্মের সংজ্ঞা রয়েছে। দেশ থেকে দেশান্তরে যাত্রা করা উদ্বাস্তু নিমাই মাস্টারের কাছে ধর্মের সংজ্ঞা তার বৃত্তি, তার ধর্মাচরণ, তার সামাজিক দায়িত্ববোধ। মৌলবাদী রফিকের কাছে ধর্মের সংজ্ঞা "প্রশমন"। খাসরঙ্গের কাছে "গোষ্ঠীর অখণ্ডতা"। এখানে উল্লেখ্য দেবপ্রতিম দাশগুপ্ত, অজয় ত্রিপুরা এবং সঞ্জয় করের দুর্দান্ত অভিনয়। সঞ্জয় কর একজন অত্যন্ত সংবেদনশীল ব্যক্তির চরিত্রে প্রাণ ফুটিয়েছেন। "জাত-যাওয়ার কারখানা" থেকে মানসিক ভাবে মুক্ত এই চরিত্রে কি মন্ত্রবলে তিনি প্রাণ ফুটিয়েছেন তা নিয়ে কৌতূহল রইলো। (স্পয়লার দিচ্ছি না। নিজেরা হলে উপভোগ করুন।)
ইম্প্রেশন:
এবার আসি ইম্প্রেশনে। আমাদের চূড়ান্ত অভিজ্ঞতাগুলো আমাদের মনে এক একটি প্রতীতি তৈরী করে। সেটা জটিল কোনো বিষয় না। আদিমানব বনের বিষাক্ত ফল থেকে বাঁচতে এই আদিম প্রবৃত্তিকেই হাতিয়ার করেছিল। একসময়ের ছাত্র রফিক তার শিক্ষক নিমাইয়ের বাড়ি তছনছ করে দেয়। নিমাইয়ের মনে একটা ইম্প্রেশনের জন্ম হয়। ভারতবর্ষে ফিরে কিভাবে সুপ্তভাবে সেই ইম্প্রেশন তাকে ভেতরে ভেতরে গ্রাস করেছে তা আমরা ছবির শেষের দিকে টের পাই। কাহিনীর আঙ্গিকে খুব সুক্ষ অংশ এটা। অন্তর্মুখী হতে বাধ্য করে। এই ইম্প্রেশনের ইন্দ্রজালে আটকে রয়েছে রফিক, খাসারং এমনকি নিমাইয়ের হারিয়ে যাওয়া মেয়ে অসীমাও।
পরিযায়ী ছায়াছবির সাথে মার্কিন সিনেমা "মিনারি"র কিছুটা মিল পেলাম। মিনারি মুভিতে আবার ১৯৪৮ সালে অ্যান্ড্রু ওয়াইয়েথের আঁকা ক্রিস্টিনা'স ওয়ার্ল্ড ছবিটার ভিজ্যুয়াল রেফারেন্স রয়েছে। খোলা মাঠের মাঝে অসহায় এক মেয়ে তার বাড়ির দিকে হাত বাড়িয়ে রয়েছে। নিমাই ও অসীমার গল্প ক্রিস্টিনার জীবন থেকেও বেশি জটিল। আবার মৌলিক ভাবনাগুলো অনেক বেশি সহজ।
আলোচনা
দেশের প্রতি মানুষের অন্তরঙ্গ টান জাগতিক সমস্ত ভালো-লাগা, বিস্ময় ও ভালোবাসার উপসংহার। পার্বতীর ঘাম থেকে গণেশের প্রতিরূপ গড়ে ওঠার মতো দেশের সোনা মাটি থেকে আমাদের সৃষ্টি। এই নির্মল ভালো লাগা, ভালোবাসা, আবেগ আবার তার সাথে মিশে থাকা ক্রোধ, মনোমালিন্য ও নিরাশার উপাদান দিয়ে তৈরী জীবনদর্শনের প্রতীক: নিমাইয়ের তাঁর দেশে ও সন্তানের প্রতি স্নেহ। অভিনেতা লোকনাথ দে তার চোখ ও কণ্ঠের মাধ্যমে এক সংগ্রামে লিপ্ত বাবার চরিত্রে প্রাণ ফুটিয়েছেন।
বিভাজনের এপার থেকে ওপার, পারে পারে আরো বিভাজন, আর তার খন্ডে খন্ডে যে সামাজিক ভাঁজগুলো রয়েছে তার মধ্যে আটকে থাকা মানুষগুলোর পেন্টিং এই ছায়াছবি। যুযুধান বিশ্বে শান্তির খোঁজে যে আবহমান মানুষের স্রোত, তার মধ্যে ভেসে যাচ্ছে আশা-আকাঙ্খা, ভিটে-মাটি, আমি-তুমি। অসীম, অতুল, ইকবাল এই কসমোপলিটান ছেলেখেলার শিকার মাত্র। আর তাদের অস্তিত্বের খোঁজে এই ছায়াছবির প্রকল্প।
কংক্রিটের স্ল্যাবের মাঝের ফোঁকর দিয়ে যেমন একটা ছোট চারাগাছ উঁকি দেয়, জিঘাংসার মাঝখানে ঠিক তেমনি ভালোবাসা ফুটে ওঠে। আর ভালোবাসা যেখানে চ্যাঁচায় না, ভালোবাসা যেখানে স্নিগ্ধ, সেখানেই ছায়াছবি নির্মাতার পারদর্শিতার প্রদর্শন। সিনেমার প্রতিটি ফ্রেম এক একটা পেন্টিং। তার মধ্যে রামধনুর সাতটা রং খুব নিপুণভাবে ব্যবহার করেছেন নির্দেশক মনেট রয় সাহা। বাস্তবসম্মত আলো ব্যবহারে সিনগুলোর মৌলিক ইম্প্যাক্ট আরো অসাধারণ হয়ে ওঠে। প্রয়োজনমতো স্টিল ফ্রেম, ক্লোজ আপ, ওয়াইড শট এবং প্রোফাইলিং করেছেন সিনেমাটোগ্রাফার জয়েশ নায়ার। অমিত চ্যাটার্জির মিউজিক এবং অনির্বান মাইতির এডিটিংকেও সাধুবাদ।
ফিরে দেখা:
জাতি-জনজাতির সমন্বয়, ধর্মী ও বিধর্মীর বিবাদ, সামাজিকতা ও আত্মীয়তার পরিধি এই বিভিন্ন জটিল বিষয়গুলোকে বিভাজনের বিভীষিকা, পূর্ব পাকিস্তানে মৌলবাদের উত্থান, ভারতের রিফাইজি ক্রাইসিস, তথা ত্রিপুরার বন্ধুর ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে খুব সহজভাবে ব্লেন্ড করেছেন নির্দেশক মনেট রয় সাহা, প্রযোজক অনিল চন্দ্র দেবনাথ এবং চিত্রনাট্যকার অমিতাভ ভট্টাচার্য্য। কিনজল নন্দা, স্বাতী মুখার্জি, সবুজ বর্ধন, রুহি দেববর্মা, রঞ্জিতা বোরা ও অন্যান্য সহ-অভিনেতাদের অভিনয়ও অনবদ্য। সিনেমাটিক অনুভূতিতে কোনো হোঁচট নেই এই ছায়াছবিতে। ত্রিপুরার ছেলে মনেট সাহার কাজ, রাজধানীর হলগুলোতে পুরোদমে চলছে। সাদাকালোর জগতে আবেগের সূক্ষ্মতা নিয়ে অনবদ্য কাজ। একটা ডিসকোর্স তৈরী হোক এই ছবির মাধ্যমে।
(লেখক ও চলচ্চিত্র পরিচালক: সান্নিধ্য দাশ।)
আরও পড়ুন...