জনপ্রতিনিধিদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বার্তা: ত্রিপুরা বিধানসভার ঐতিহাসিক কর্মশালা

জয়ন্ত দেবনাথ

February 28, 2026

গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে আরও সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে ত্রিপুরা বিধানসভার উদ্যোগে আগরতলার প্রজ্ঞা ভবনে ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হলো এক বিশেষ সেমিনার ও কর্মশালা। “জনপ্রতিনিধিদের সকল শ্রেণি ও স্তরের মানুষের প্রতি দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা” (Responsibility and Accountability of Public Representatives to All Sections of People)- শীর্ষক এই একদিনের কর্মসূচি ত্রিপুরায় সম্ভবত এই প্রথম আয়োজিত হলো।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এত বড় আকারের একটি অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হলেও অন্যান্য সরকারি কর্মসূচির মতো ব্যাপক প্রচার, ব্যানার বা ফ্লেক্সের বাহুল্য চোখে পড়েনি। সংযম ও শালীনতার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন হয়। কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের নির্দেশিকা অনুযায়ী আয়োজিত এই কর্মশালায় ত্রিপুরার প্রায় সব রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন, যা সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক বিরল দৃষ্টান্ত।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ত্রিপুরার মহামান্য রাজ্যপাল ইন্দ্র সেনা নাল্লু রেড্ডি। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী ডা. মানিক সাহা এবং বিশেষ অতিথি ও প্রধান বক্তা ছিলেন রাজ্যসভার উপ-সভাপতি হরিবংশ নারায়ণ সিং। এছাড়াও রাজ্যের মন্ত্রীসভা সদস্য, বিধায়ক, পুরসভা, জেলা পরিষদ ও নগর পঞ্চায়েতের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

বক্তব্য রাখতে গিয়ে রাজ্যপাল, মুখ্যমন্ত্রী ও রাজ্যসভার উপ-সভাপতি একবাক্যে বলেন-গণতন্ত্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন জনপ্রতিনিধিরা স্বচ্ছতা, সততা ও জবাবদিহিতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।

মুখ্যমন্ত্রী ডা. মানিক সাহা বলেন, “জনগণের প্রতি জবাবদিহিতা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি। জনপ্রতিনিধিদের প্রথম কর্তব্য মানুষের কথা শোনা এবং তাঁদের সঙ্গে বিনয়ী ও শ্রদ্ধাশীল আচরণ করা। হাসিমুখে ও নম্র ব্যবহারের মধ্য দিয়েই প্রকৃত জনসংযোগ গড়ে ওঠে।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন, নতুন প্রজন্ম যেন বর্তমান নেতৃত্বকে সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করে, সে জন্য নিষ্ঠা ও দায়বদ্ধতাকে পথপ্রদর্শক নীতি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। “এক ত্রিপুরা, শ্রেষ্ঠ ত্রিপুরা” ও “নতুন ত্রিপুরা” গঠনের লক্ষ্যে দলমত নির্বিশেষে সম্মিলিত ভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

রাজ্যসভার উপ-সভাপতি হরিবংশ নারায়ণ সিং তাঁর বক্তব্যে সংবিধান মেনে চলা, সংসদীয় রীতি-নীতি রক্ষা এবং জনজীবনে স্বচ্ছতা বজায় রাখার ওপর জোর দেন। তিনি মত প্রকাশ করেন যে, এ ধরনের উদ্যোগ দেশের প্রতিটি রাজ্যে নিয়মিত আয়োজন করা উচিত এবং তা ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করবে।

ত্রিপুরা বিধানসভার ডেপুটি স্পিকার রামপ্রসাদ পাল, পার্লামেন্টারি বিষয়ক মন্ত্রী রতনলাল নাথ এবং বিধানসভার মুখ্য সচেতক কল্যাণী রায়ের আন্তরিক উদ্যোগে, কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশন (CPA) ইন্ডিয়া রিজিওনের দিকনির্দেশনায় অনুষ্ঠানটি আয়োজিত হয়। অংশগ্রহণকারী অধিকাংশ জনপ্রতিনিধি এই কর্মসূচিকে সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ হিসেবে অভিহিত করেন এবং বিধানসভা থেকে পঞ্চায়েত স্তর পর্যন্ত সকল জনপ্রতিনিধিকে নিয়ে বছরে অন্তত একবার আত্মসমালোচনামূলক এধরনের কর্মশালার আয়োজনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রেখেছেন সাংসদ রাজীব ভট্টাচার্য, কৃতি সিং দেববর্মা, মন্ত্রী রতনলাল নাথ, অনিমেষ দেববর্মা, বিধায়ক গোপাল রায়, দীপঙ্কর সেনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা। অনুষ্ঠানে উপস্থিত না থাকতে পারলেও সাংসদ বিপ্লব দেব কোলকাতা থেকে ভিডিও কনফারেন্সে তার সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন এবং এই অনুষ্ঠানের সাফল্য কামনা করেন। বিরোধী দলনেতা জীতেন্দ্র চৌধুরীর লিখিত ভাষণ অনুষ্ঠানে পাঠ করেন সিপিএম বিধায়ক সুদীপ সরকার। শ্রী চৌধুরী তার সংক্ষিপ্ত ভাষনে এধরনের ওয়ার্কশপ আয়োজনের জন্য বিধানসভার ডেপুটি স্পিকার রামপ্রসাদ পাল ও তাঁর টিমকে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানান। এবং আরও বিস্তৃত পরিসরে প্রতি বছর এধরনের ওয়ার্কশপ আয়োজনের অনুরোধ করেন।

শুধু রাজ্যপাল, মুখ্যমন্ত্রী, রাজ্যসভার ডেপুটিচেয়ারম্যান কিংবা বিরোধী দল নেতাই নন, অনুষ্ঠানের সকল বক্তারাই ত্রিপুরা বিধানসভার ডেপুটি স্পিকার ও সংশ্লিষ্ট টিমকে এধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজনের জন্য ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানান। আসামের শিলচর থেকে নির্বাচিত সাংসদ পরিমল শুক্ল বৈদ্য বলেন, ‘এক ভারত শ্রেষ্ঠ ভারত’ গড়ার লক্ষ্যে জনপ্রতিনিধিদের সক্রিয় ও গঠনমূলক ভূমিকা অপরিহার্য। এই লক্ষ্যে ত্রিপুরা বিধানসভার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রামপ্রসাদ পাল জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতা স্মরণ করাতে ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠানের যে আয়োজন করেছেন তা অত্যন্ত সময়োপযোগী বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেছেন।

২০১৮ সালে ত্রিপুরায় রাজনৈতিক পালাবদলের পর বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা, সংঘর্ষ ও অস্থিরতার ঘটনা ঘটেছে। শাসক দল ও বিরোধী দলগুলির মধ্যে, এমনকি জোটসঙ্গীদের মধ্যেও সংঘাতের নজির রয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে সকল দলের জনপ্রতিনিধিদের এক মঞ্চে এনে দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা নিয়ে আলোচনা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক বার্তা বহন করে।

বিরোধী শিবিরের বর্ষীয়ান নেতা, প্রাক্তন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি ও বনমালীপুরের বিধায়ক গোপাল চন্দ্র রায়ও কর্মশালার প্রশংসা করেন। তবে তিনি বিধানসভার কার্যদিবস হ্রাস এবং বিরোধীদের জনস্বার্থমূলক বিষয় উত্থাপনের সুযোগ সীমিত হওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, গঠনমূলক সমালোচনাকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করা উচিত, কারণ বিরোধীরা ব্যক্তিগত নয়, জনস্বার্থের বিষয়েই কথা বলেন।

অনুষ্ঠানের আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক ছিল, কংগ্রেস, সিপিএম, বিজেপি, তিপ্রা মথা ও আইপিএফটি সহ বিভিন্ন দলের জনপ্রতিনিধিদের একসঙ্গে মধ্যাহ্নভোজে অংশগ্রহণ। রাজনৈতিক ভিন্নমত সত্ত্বেও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে এই মিলন দৃশ্য অনেকের কাছেই বিরল ও আশাব্যঞ্জক বলে প্রতীয়মান হয়।

অনুষ্ঠান-পরবর্তী সময়ে মুখ্যমন্ত্রীসহ একাধিক জনপ্রতিনিধি সামাজিক মাধ্যমে কর্মশালার প্রশংসা করে বার্তা প্রকাশিত করেন। সাধারণ মানুষও সেখানে প্রতিক্রিয়া জানান। কেউ সমর্থন জানিয়ে বলেন, “নতুন ত্রিপুরা” গড়তে হলে সকল দলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। আবার কেউ কেউ কর্মসংস্থান, দুর্নীতি, মাদকাসক্তির বিস্তার ও যুবসমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

সব মিলিয়ে, এই একদিনের সেমিনার ও কর্মশালা কেবল আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, বরং এটি ছিল আত্মসমীক্ষা, দায়বদ্ধতার পুনরুচ্চারণ এবং গণতন্ত্রকে আরও জনমুখী করার এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

গণতন্ত্রকে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রূপে গড়ে তুলতে এ ধরনের উদ্যোগ ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে, এমন প্রত্যাশাই ব্যক্ত করেছেন অংশগ্রহণকারীরা। নতুন প্রজন্মের জন্য নৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো একটি সম্ভাবনাময় ত্রিপুরা নির্মাণে বাস্তবিক অর্থে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের জনপ্রতিনিধিরা কতটা আন্তরিক উদ্যোগ ভবিষ্যতে নেবেন এই নিয়ে সংশয়, দ্বিধা ও দ্বন্দ্ব থাকলেও ত্রিপুরার বুকে প্রথম বারের মতো আয়োজিত এই কর্মশালা একটি তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে এটা অনস্বীকার্য।

(লেখক: জয়ন্ত দেবনাথ, সিনিয়র সাংবাদিক ও ত্রিপুরাইনফো-র সম্পাদক)

আরও পড়ুন...


Post Your Comments Below

নিচে আপনি আপনার মন্তব্য বাংলাতেও লিখতে পারেন।

বিঃ দ্রঃ
আপনার মন্তব্য বা কমেন্ট ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষাতেই লিখতে পারেন। বাংলায় কোন মন্তব্য লিখতে হলে কোন ইউনিকোড বাংলা ফন্টেই লিখতে হবে যেমন আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড (Avro Keyboard)। আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ডের সাহায্যে মাক্রোসফট্ ওয়ার্ডে (Microsoft Word) টাইপ করে সেখান থেকে কপি করে কমেন্ট বা মন্তব্য বক্সে পেস্ট করতে পারেন। আপনার কম্পিউটারে আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড বাংলা সফ্টওয়ার না থাকলে নিম্নে দেয়া লিঙ্কে (Link) ক্লিক করে ফ্রিতে ডাওনলোড করে নিতে পারেন।

Free Download Avro Keyboard

Fields with * are mandatory





Posted comments

Till now no approved comments is available.