সৌম্যদীপ দেব : আমার অনুভবে
সুশীল চন্দ্র গোপ
February 21, 2026
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ছোট্ট পাহাড়ি রাজ্য ত্রিপুরা। সবুজ অরণ্য, টিলা, নদী আর শান্ত প্রকৃতির কোলে গড়ে ওঠা এই রাজ্য শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য নয়, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও সমৃদ্ধ। এই ত্রিপুরা রাজ্যেই জন্ম ও বেড়ে ওঠা এক অনন্য সাহিত্যিক ও গবেষক সৌম্যদীপ দেব এর। তিনি আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একজন উজ্জ্বল মুখ, যাঁর চিন্তাশক্তি, লেখনী ও সাহিত্য-ভাবনা আজ রাজ্যের গণ্ডি পেরিয়ে সুদূর প্রসারিত।
প্রথম দেখায় সৌম্যদীপ দেবকে খুব সাধারণ মানুষ বলেই মনে হয়। কিন্তু একটু কথা বললেই বোঝা যায়, তাঁর মনের ভেতর বইয়ের পর বই সাজানো আছে। আসলে পণ্ডিত জন হয়তো এমনই হন, খুব সহজে ধরা দেন না৷ চলা ফেরায় কতটা সরল জীবনযাপন করেন। রাজ্যের বুকে সনামধন্য একজন শিক্ষক৷ এতো বড় স্কুলে কর্মরত আছেন, তা-ও নিজেকে কতটা মাটির কাছাকাছি রাখেন নিজেকে৷ তিনি এমন একজন মানুষ, যাঁর চিন্তা সবসময় নতুন কিছু খোঁজে। সাহিত্য তাঁর কাছে শুধুই লেখা নয়, বরং সমাজকে বোঝার একটি শক্তিশালী মাধ্যম।
ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনা ও লেখালেখির প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। বই পড়া ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ—সব ধরনের সাহিত্যই তাঁকে আকর্ষণ করত। কিন্তু উপন্যাস ও গল্প তাঁর বেশি পছন্দের৷ ধীরে ধীরে সেই পড়ার অভ্যাসই তাঁকে লেখার জগতে নিয়ে আসে। তাঁর কলমে ফুটে ওঠে সমাজ, মানুষ, ইতিহাস ও উত্তরপূর্ব ভারতের জীবনচিত্র।
সৌম্যদীপ দেব বাংলা ভাষাকে ভালোবাসেন। তিনি মনে করেন, ভাষা শুধু ভাব প্রকাশের মাধ্যম নয়, এটি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের পরিচয়ক। তাই তাঁর লেখায় বাংলা ভাষার সৌন্দর্য ও গভীরতা স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। সাহিত্য জগতে তিনি এমন প্রতিভা যিনি নীরবে কিন্তু দৃঢ়ভাবে নিজের কাজ করে চলেছেন।
তিনি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও শারদ সংখ্যায় নিয়মিত লিখে থাকেন। তাঁর লেখা পড়ে পাঠকরা নতুনভাবে ভাবতে শেখে। কবি, সাহিত্যিক ও গবেষকদের কাছেও তিনি অত্যন্ত সমাদৃত। তাঁর চিন্তাশক্তি ও বিশ্লেষণাত্মক ধারালো আলোচনা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছে।
সৌম্যদীপ দেবের একটি বিশেষ অবদান হলো— 'গল্পের জন্য' উত্তরপূর্বের গল্প চর্চার পরিসর নামক গল্প চর্চার উদ্দেশ্যে বিশেষ উদ্যোগ। অবশ্যই এই উদ্যোগের সঙ্গে আছেন ঔপন্যাসিক দুলাল ঘোষ, অধ্যাপক ড.গীতা দেবনাথ, অধ্যাপক ড.নারায়ণ ভট্টাচার্য, গল্পকার সুজয় রায় প্রমুখ। এই প্ল্যেটফর্ম উত্তর-পূর্ব ভারতের অজানা, অবহেলিত ও মূল্যবান গল্পগুলোকে পাঠকের সামনে তুলে ধরছে নিয়মিত প্রতিবছর। এটি শুধু একটি সাহিত্য প্রকল্প নয়, বরং উত্তরপূর্ব ভারতের মানুষের জীবন ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরার এক আন্তরিক প্রয়াস। এই উদ্যোগ প্রমাণ করে, সাহিত্য কীভাবে সমাজের সেতুবন্ধন গড়ে তুলতে পারে।
রম্য দৃষ্টিতে বললে, সৌম্যদীপ দেব এমন একজন মানুষ, যিনি চা খেতে খেতেও একটি প্রবন্ধের ভাবনা সাজিয়ে ফেলতে পারেন। পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে তাঁর মাথায় গল্পের প্ল্যট এসে যায়। কখনও মনে হয়, তিনি যেন প্রকৃতির সঙ্গে কথা বলেন, আর প্রকৃতি তাঁকে গল্প শোনায়।
সবচেয়ে প্রশংসনীয় বিষয় হলো তাঁর বিনয়। এত কৃতিত্বের পরেও তিনি খুব সাধারণ জীবনযাপন করেন। সাহিত্যিক অহংকার তাঁর চরিত্রে নেই। তিনি বিশ্বাস করেন—শিখতে হলে আজীবন শিখতে হয়। এই মানসিকতাই তাঁকে আরও বড় করে তুলছে। নিজেকে বরাবর মাটির কাছাকাছি রাখতে পছন্দ করেন।
আজ সৌম্যদীপ দেব বাংলা সাহিত্যের এক প্রজ্জ্বলিত প্রদীপশিখা। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—ছোট জায়গা থেকে বড় স্বপ্ন দেখা যায়, আর নিষ্ঠা ও পরিশ্রম থাকলে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়।
শেষে, তাঁর সুন্দর জীবন, সুস্বাস্থ্য ও সার্বিক শ্রীবৃদ্ধি কামনা করি। তিনি যেন আরও বহুদিন বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে তুলতে পারেন—এই কামনাই রাজ্যবাসী ও সাহিত্যপ্রেমী সকলের। আপনার জন্য আমরা সকলে গর্ববোধ করি। ত্রিপুরার বুকে আপনার এই প্রতিভা আমাদের অহংকার।
আরও পড়ুন...