পূর্বোত্তরের পরিপ্রেক্ষিতে মাতৃভাষা দিবস
পান্নালাল রায়
February 20, 2026
ওপারের ভাষা সংগ্রামের ক্ষেত্রে একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটি যেমন অমর হয়ে আছে তেমনই তা আজ গোটা দুনিয়াতেই সকলের মাতৃভাষা সুরক্ষার দিশারিতে পরিণত হয়েছে।একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটি আজ দেশে দেশে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে।এই বিশেষ দিনটির উদযাপন আজ আর কোনও ভৌগোলিক গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই।সকল ভাষার সম্মানে,সকলের মাতৃভাষার বিকাশে তা যেন আজ এক দিকচিহ্ণ!আর গৌরবের বিষয় হচ্ছে, একুশে ফেব্রুয়ারি 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে উদযাপনের সলতে পাকানোর মতো কাজটি একদিন সম্ভবত ত্রিপুরা শুরু করেছিল।আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপনের আহ্বান উত্তর পূর্বাঞ্চলের পক্ষেও খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
সেদিন ঢাকার রাজপথ লাল হয়ে গিয়েছিল সালাম-বরকত-জব্বারদের তাজা রক্তে।মাতৃভাষার জন্য সংগ্রামের ক্ষেত্রে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল একুশে ফেব্রুয়ারি।বাহান্নের একুশে ফেব্রুয়ারির পর পদ্মা-মেঘনা দিয়ে গড়িয়ে গেছে অনেক জল। কালক্রমে মাতৃভাষার আন্দোলন রূপ নিয়েছে মাতৃভূমির আন্দোলনে।একাত্তরে মানচিত্রে ভূমিষ্ঠ হয়েছে এক নতুন দেশ,বাংলাদেশ। তারপর সাড়ে পাঁচ দশকে নানা ঘটনা প্রবাহ।নেতা বদল,নীতি বদল।কখনও রক্তের হোলি,কখনও গৃহদাহ-বহ্নুৎসব,সৃষ্টি হয়েছে ধ্বংস আর নিপীড়নের নয়া ইতিহাস। কখনও আবার কোনও কোনও মহলে অস্বীকৃত হয়েছে স্বাধীনতা,স্বাধীনতার ইতিহাস। তবু অম্লান একুশের ঐতিহ্য।একুশকে কেউ মুছে ফেলতে পারবে না।একুশে ফুটে পলাশ, উদ্বেল হয় মানুষ।দেশকালের গণ্ডী ছাড়িয়ে সকলের মাতৃভাষার জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে আছে একুশে ফেব্রুয়ারি।
মাতৃভাষার জন্য সংগ্রাম অবশ্য নতুন কোনও বিষয় নয়।নতুন নয় মাতৃভাষা সুরক্ষার লড়াইয়ের ঘটনাও।আমাদের দেশের নানা অঞ্চলেও বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর নিজ নিজ মাতৃভাষা সুরক্ষার লড়াইয়ের ঘটনার নজির রয়েছে।ঘটেছে রক্তক্ষয়ী ঘটনাও।ওপারের একুশের মতো মাতৃভাষার আন্দোলনের ক্ষেত্রে এপারেও অমর হয়ে আছে উনিশে মে।১৯৬১ সালের এই দিনটিতেই মাতৃভাষার জন্য শিলচরে শহিদ হয়েছিলেন এগারো জন।সেদিনের এই ভাষা আন্দোলনকে কেউ কেউ গণ অভ্যুত্থান হিসেবেও অভিহিত করেছেন।সেদিন আসামের অবিভক্ত কাছাড়ের বাংলা ভাষাভাষি মানুষ আসামের রাজ্যভাষা বিলের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলেন।এই বিলে আসামের একমাত্র সরকারি ভাষা করা হয়েছিল অসমীয়াকে।এর প্রতিবাদে নিজেদের মাতৃভাষার দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছিল কাছাড়।১৯ মে ডাক দেয়া হয়েছিল সর্বাত্মক হরতালের।শিলচরে রেলস্টেশনে ছিল
পিকেটারদের ভিড়।চলে লাঠি,গুলি।হাজার হাজার সত্যাগ্রহীকে গ্রেপ্তার করা হয়।পুলিশের গুলিতে মৃত্যু ঘটে এগারো জনের।মাতৃভাষার সুরক্ষার জন্য একটি আন্দোলন ঘিরে একসঙ্গে এগারোজনের শহিদ হবার ঘটনা নজির বিহীন।
শুধু বাংলা ভাষার জন্য কাছাড় কেন,দেশের নানা অঞ্চলেই মাতৃভাষার জন্য আত্মবলিদানের দৃষ্টান্ত আছে।এমনকি কাছাড়েও পাথারকান্দিতে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষার জন্য সুদেষ্ণা সিংহের শহিদ হবার ঘটনা উজ্জ্বল হয়ে আছে মাতৃভাষার জন্য আন্দোলনের ইতিহাসে।দেশের দক্ষিণাঞ্চলেও ভাষা আন্দোলন ঘিরে আত্মবলিদানের নজির রয়েছে।এই ভাবে মাতৃভাষা সুরক্ষার সমস্যা,নানা আশঙ্কা যেমন রয়েছে,তেমনই তাকে কেন্দ্র করে নানা সময়ে নানা আন্দোলনও হয়েছে দেশে এবং এখনও তা হচ্ছে।এইসব ঘটনা প্রবাহের পরিপ্রেক্ষিতে একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে উদযাপনের বিষয়টি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।
২০০০ সাল থেকে ২১ শে ফেব্রুয়ারি দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।ভাষিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি সহ বহুভাষাবাদের পৃষ্ঠপোষকতায় পৃথিবী ব্যাপী দিনটি পালিত হচ্ছে।১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো প্রথম এই দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দেয়।পরে রাষ্ট্রসংঘ তাতে শিলমোহর দেয়।এবারও দেশে দেশে নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপনের কর্মসূচি রয়েছে।এ বছরের উদযাপন কর্মসূচিতে বহুভাষায় শিক্ষা তথা শিক্ষার মানোন্নয়নে মাতৃভাষা ভিত্তিক শিক্ষা,জনজাতি ভাষা এবং ডিজিটাল ক্ষমতায়নের উপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপনের রজত জয়ন্তী বর্ষ পূর্তি হয়েছে।এবছর সে বিষয়েও গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে।
ইউনেস্কোর হিসাব অনুসারে পৃথিবীতে ৮ হাজার ৩২৪টি ভাষায় বলা ও লেখা হয়ে থাকে।এর মধ্যে বর্তমানে প্রায় ৭ হাজারটি ভাষা চালু অবস্থায় আছে।পৃথিবীর বেশিরভাগ ভাষাই রয়েছে এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশে।এর মধ্যে এশিয়াতে ব্যবহৃত হয় ২,৩০০ এবং আফ্রিকাতে ২,১০০ টি ভাষা।তবে যত ভাষা আছে তার খুব সামান্য অংশ,প্রায় ০.৩ শতাংশ,ব্যবহার করেন পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ।কথা বলেন ২০টি ভাষায়।উল্লেখ করা যায় যে,আমাদের দ্রুত পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে নিত্য হারিয়ে যাচ্ছে নানা ভাষা।এই ভাবে বিলোপের আশঙ্কার মুখে রয়েছে ৪০ শতাংশ ভাষা।ভাষার এই বিলুপ্তি নিঃসন্দেহে মানব সভ্যতার পক্ষে এক অপূরণীয় ক্ষতি।কিন্তু কেন হারিয়ে যাচ্ছে ভাষা? কখনও মাতৃভাষায় শিক্ষার প্রতি অনাগ্রহ,কখনও মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগের অভাব,কখনও বহুল ব্যবহৃত আধিপত্যশীল ভাষার চাপ,শিক্ষা ব্যবস্থায় মাতৃভাষাকে উপেক্ষা,নগরায়ন ও অভিবাসন,জীবিকার প্রয়োজনে বহুল ব্যবহৃত ভাষার প্রয়োগ,ডিজিটাল মাধ্যমেও প্রধান ভাষার ব্যবহার- এই সব কারণেই হারিয়ে যাচ্ছে নানা ভাষা।হারিয়ে যাচ্ছে ইতিহাস ও স্মৃতির ধারাবাহিকতা,লোকজ জ্ঞান, মৌখিক সাহিত্য,গান-গল্প-প্রবাদ প্রবচন,সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ইত্যাদি।রিক্ত হচ্ছি আমরা।ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়,এটি মানুষের আত্মপরিচয়। ভাষা হারিয়ে গেলে মানব সভ্যতাও দরিদ্র হয়ে পড়ে।তাই ভাষাকে বাঁচানো মানে মানব সভ্যতাকেই বাঁচিয়ে রাখা।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন নিঃসন্দেহে আমাদের সকলের মাতৃভাষা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সুরক্ষার পক্ষে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।ইউনেস্কোর ঘোষণার পর ২০০০ সাল থেকে দেশে দেশে তা উদযাপিত হয়ে আসছে।একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটি এখন আর শুধু ওপারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।একুশের আহ্বান ছড়িয়ে পড়েছে আজ দেশ দেশান্তরে।আর এ ক্ষেত্রে ছোট্ট ত্রিপুরারও রয়েছে এক ভূমিকা। ১৯৯৪ সাল থেকে ত্রিপুরায় একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটি 'মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে পালিত হয়ে আসছিল।সকল ভাষার সম্মান ও সকল ভাষার বিকাশে একুশে ফেব্রুয়ারি ত্রিপুরাতে মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালনের প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন রাজ্যের তদানীন্তন শিক্ষামন্ত্রী অনিল সরকার।সেদিন তিনি বলেছিলেন, বহু ভাষাভাষি ঐতিহ্যের দেশে ঐক্যের মালা সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে ত্রিপুরাতে এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।ছাত্রছাত্রীদের সমাবেশ,কবিতা উৎসব,আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদির মাধ্যমে দিনটি উদযাপন শুরু হয়েছিল।বর্তমানেও অব্যাহত আছে এই ধারা।ত্রিপুরাতে একুশে ফেব্রুয়ারি 'মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে উদযাপনের পাঁচ বছর পর থেকে দিনটি 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে উদযাপনের ঘোষণা হয় ।
এবার আসা যাক বহু ভাষাভাষি উত্তর পূর্বাঞ্চলের পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপনের কথায়।উত্তর পূর্বাঞ্চলেও অনেক ভাষা আজ বিপন্ন। ইউনেস্কোর বিবেচনায় ভারতের বিপন্ন ১৯৭টি ভাষার মধ্যে উত্তর পূর্বাঞ্চলেই রয়েছে প্রায় ৬৪ থেকে ৮০টি ভাষা।ব্যবহারকারীর অভাবে বিলোপের আশঙ্কার মুখে রয়েছে এই সব ভাষা।উদাহরণস্বরূপ বলা যায় মণিপুরের পুরুম ও তারাও, মিজোরামের বাওয়াম ও রালতে ইত্যাদি।আবার ক্ষুদ্র ভাষাগোষ্ঠীর কোনও কোনও ভাষা পরম মমতায় লালিত হচ্ছে,অস্তিত্বের সংগ্রাম করে তারা টিকে আছে।
উত্তর পূর্বাঞ্চলে যেমন ক'টি ভাষাকে সংবিধানের অষ্টম তপশীলের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি রয়েছে,তেমনই রয়েছে লিপির সমস্যাও।যেমন ত্রিপুরার জনজাতি সম্প্রদায়ের মধ্যে বহুল ব্যবহৃত ককবরক ভাষার লিপি নিয়ে রয়েছে বিতর্ক।সংশ্লিষ্ট ভাষাভাষিদের এক অংশ যখন রোমান লিপির দাবি করছে,তখন অপর একটি অংশ আবার ভারতীয় ভাষার লিপি ব্যবহারের পক্ষে।বর্তমানে বাংলা এবং রোমান-দুই লিপিতেই ককবরক লেখা হচ্ছে।ককবরক ভাষার বিকাশের স্বার্থে অবিলম্বে যে লিপি বিতর্কের অবসান প্রয়োজন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না!দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো মাঝে মাঝে উত্তর পূর্বাঞ্চলের নানা অংশেও বৃহৎ ভাষা গোষ্ঠীর আগ্রাসনের আশঙ্কা দেখা দেয় অপেক্ষাকৃত ছোট ভাষাগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে।বলা হয়ে থাকে মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধের মতো।সকলের মাতৃভাষা সকল সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে খুবই প্রিয়।মাতৃভাষার প্রতি মানুষের আবেগ অন্তরের অন্তঃস্হল থেকে উৎসারিত হয়।তাই সকলের মাতৃভাষার প্রতি সকলের সম্মান যেমন কাম্য,তেমনই কাম্য সকল ভাষার বিকাশ।
এই পরিপ্রেক্ষিতে উত্তর পূর্বাঞ্চলে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপনের আহ্বান খুবই গুরুত্বপূর্ণ।এটা আর নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই যে,ভারতের ভাষা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের এক জীবন্ত যাদুঘর হচ্ছে উত্তর পূর্বাঞ্চল।ক্ষুদ্র বা বৃহৎ,যাই হোক, প্রতিটি ভাষাগোষ্ঠীর ভাষাকে টিকিয়ে রাখার সংগ্রামে আলোর দিশারি হতে পারে উত্তর পূর্বাঞ্চল!
আরও পড়ুন...