না বলা অনেক কথা সময়ের দলিল
ড.আশিস কুমার বৈদ্য
February 2, 2026
সম্প্রতি হাতে এল পান্নালাল রায়ের 'না বলা অনেক কথা' গ্রন্হটি।সাবলীল লেখার মাধ্যমে লেখক গ্রন্হটিতে তাঁর জীবনের ফেলে আসা দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করেছেন।কিন্তু মূলত আত্মজীবনীমূলক গ্রন্হ হলেও গ্রন্হটিতে উঠে এসেছে গত প্রায় ছয় দশকের সময়কাল।সুদীর্ঘকাল ধরে পান্নাবাবু উত্তরপূর্বাঞ্চল ভিত্তিক ইতিহাস, রাজনীতি,সংস্কৃতি,সামাজিক নানা বিষয়ে নিরন্তর লিখে চলেছেন।এই অঞ্চলের পত্র পত্রিকায় যেমন নিয়মিত তাঁর লেখা প্রকাশ পাচ্ছে,তেমনই প্রায় প্রতিবছরই প্রকাশিত হচ্ছে তাঁর একাধিক গ্রন্হ।সহজ সরল গদ্যে নানা জটিল বিষয়ে পান্নালাল রায়ের উপস্থাপনা বরাবরই পাঠকদের আকৃষ্ট করে থাকে।ব্যতিক্রম নয় আলোচ্য 'না বলা অনেক কথা' গ্রন্হটিও।একবার পাঠ শুরু করলে আড়াই শতাধিক পৃষ্ঠার বইটি পাঠককে শেষ করতেই হবে।
গ্রন্হটি ভাল লাগবে এই কারণে যে,তিনি আত্মকথন গ্রন্হনার প্রেক্ষাপটে একদিকে যেমন শৈশব-কৈশোর-যৌবন ও প্রৌঢ় জীবনের অনুভব ঋদ্ধ নানা কথা শুনিয়েছেন,তেমনই তার পাশাপাশি প্রলম্বিত কালসীমা,সমসাময়িক আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষিতও তুলে ধরেছেন। আলো ফেলেছেন সেই সময়কার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উপরও।গ্রন্হটির শুরুতেই লেখকের নিবেদনে শ্রীরায় লিখেছেন,২০২০ সালের কোভিডকালের গৃহবন্দি জীবনে তিনি সামাজিক মাধ্যমে লিখতে শুরু করেছিলেন 'না বলা অনেক কথা'।শৈশব-কৈশোর-কর্মজীবনের পর আসতে থাকল অতীত দিনের নানা চিত্র, এলো রাজনীতিও।লেখক বলেছেন, "...নিজের কথা বলতে বলতে সময়কালকে ধরার চেষ্টা করলাম।প্রায় ছয় দশকের এক দীর্ঘ সময়কাল।যোগাযোগে টরেটক্কার যুগ থেকে ইন্টারনেট, মুদ্রণে লেটারহেড প্রেস থেকে কালার অফসেট!এলো আসাম-আগরতলা সড়কপথে ভ্রমণ।সাথে রেলপথের কথাও চলে এলো স্বাভাবিকভাবেই।আবার রাজনীতিও চলে এলো!ত্রিপুরায় প্রথমে কংগ্রেস, তারপর বামফ্রন্ট,মাঝে আবার কংগ্রেস জোট,তারপর একনাগাড়ে আড়াই দশক বাম শাসন।বর্তমানে চলছে বিজেপি জোট। এ ভাবেই যৎসামান্য এসেছে দেশেরও রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহ।" এই দীর্ঘ সময়ের প্রতিচ্ছবি সবটা না হলেও গ্রন্হটিতে পাওয়া গেল বেশ কিছুটা।ছয় দশকের কালদর্পণে প্রত্নতাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক,রাজনৈতিক,আর্থ-সামাজিক পট পরিবর্তনের ধারাভাষ্য অনেকটাই পাওয়া গেল আত্মকথনের নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোয়।গ্রন্হটি তাই নিছক আত্মজীবনীমূলক বর্ণনা হয়ে উঠেনি।এটি যেন হয়ে উঠেছে সময়ের এক দলিল। নানা অনুকূল-প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে যাপিত জীবনের পাশাপাশি তা হয়ে উঠেছে সাহিত্য-ইতিহাস চেতনার এক যুগলবন্দিও!গ্রন্হটিতে ১১৮টি অনুচ্ছেদের শিরোনামেই বোঝা যায় 'না বলা অনেক কথা'র ব্যাপ্তি।টরেটক্কার যুগে,একদিন দৈনিক সংবাদে,প্রাইমারী স্কুলে,চীন ভারত যুদ্ধ, সেদিনের আগরতলা,পাক-ভারত যুদ্ধে ট্রেঞ্চ খনন,সেদিনের ফুটবল,একাত্তরের যুদ্ধ,কংগ্রেসে অন্তর্কোন্দল,কর্মচারী ধর্মঘট,ইন্দিরার বিরুদ্ধে ক্ষোভের বিস্ফোরণ,চাকরির প্রথম দিনটি,মাদার টেরেসার সঙ্গে,মৃণাল সেনের সঙ্গে,সাংবাদিকদের নিয়ে মিজোরামে,বিমল সিংহের হত্যাকাণ্ড,রাঙ্খলের জেনেভা ভাষণ,শেখ হাসিনার রাজ্য সফর ইত্যাদি সূচির পর এসেছে কোভিডকালের উপলব্ধি জীবন যেন পদ্মপাতায় জল।সব মিলিয়ে আত্মকথন ও সমসাময়িক ঘটনাবলির সমন্বয়ে পান্নালাল রায় এক মালা রচনা করেছেন, যার প্রতিটি ফুলের কোনোটিতে রয়েছে আনন্দময়তার সৌরভ,কোনোটিতে যেন আবার বিষন্নতার দীর্ঘশ্বাস। এটিকে আবার আত্মকথন কেন্দ্রিক এক ইতিহাস গ্রন্হও বলা যেতে পারে।নানা তথ্য বহুল সুখপাঠ্য এই গ্রন্হটি পাঠক সমাজে সমাদৃত হবে এমন আশা করা যায়।গ্রন্হটির দৃষ্টি নন্দন প্রচ্ছদ করেছেন কামনা দেব।প্রচ্ছদে ঐতিহাসিক ভাবনার প্রতিফলন ঘটেছে।
না বলা অনেক কথা,পান্নালাল রায়/ ঘরানা পাবলিকেশন,মেলার মাঠ,আগরতলা/মূল্য ৬৭০ টাকা।
আরও পড়ুন...