ককবরক লিপি বিতর্ক তুঙ্গে রাজ্যে

পান্নালাল রায়

January 22, 2026

ত্রিপুরায় ককবরক ভাষার লিপি ইস্যুতে রাজ্য রাজনীতিতে উত্তেজনার সঞ্চার হচ্ছে।বিজেপি জোট সরকারের শরিক তিপ্রা মথা যখন ককবরকের রোমান লিপির দাবিতে আন্দোলন করছে তখন রাজ্য মুখ্যমন্ত্রী সওয়াল করছেন দেশীয় ভাষার লিপির পক্ষে। ককবরকের জন্য বিজেপি দেবনাগরী লিপি চাপিয়ে দিচ্ছে কংগ্রেস এই অভিযোগ করে তার তীব্র নিন্দাও জানিয়েছে।এদিকে রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার আবার মনে করছেন ককবরকের লিপি নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অহেতুক বিতর্ক ডেকে আনছে।

গত সোমবার ৪৮তম ককবরক ভাষা দিবস উদযাপন ঘিরে রাজধানী আগরতলায় ধূন্দুমার কাণ্ড ঘটে যায়।রাজ্যের শাসক জোটের দুই শরিক বিজেপি এবং তিপ্রা মথার মধ্যে লিপি ইস্যুতে দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে উঠে এদিন। এমনকি পুলিশী হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়।এখানে উল্লেখ করা যায় যে,ত্রিপুরার প্রথম বামফ্রন্ট সরকার ত্রিপুরার জনজাতিদের প্রধান ভাষা ককবরককে রাজ্যের অন্যতম সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল।১৯৭৯ সালের ১৯ জানুয়ারি বিধানসভায় ত্রিপুরা সরকারী ভাষা সংশোধনী বিল,১৯৭৯ পেশ করা হয়েছিল। এ থেকেই দিনটি রাজ্যে ককবরক ভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।স্বাভাবিকভাবেই এ বছরও দিনটি যথাযথ ভাবে পালনে সরকারি স্তরে উদ্যোগ নেয়া হয়।কেন্দ্রীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন হয় রাজধানী আগরতলার রবীন্দ্র শতবার্ষিকী ভবনে।এই উপলক্ষ্যে বিজেপি'র বিধায়ক রামপদ জমাতিয়ার নেতৃত্বে একটি মিছিল বের হয় শহরে।কিন্তু কিছু পথ যাওয়ার পরই তিপ্রা মথার ছাত্র যুবরা মিছিলটি আটকে দিয়ে ককবরকের রোমান হরফের দাবি জানাতে থাকে।আসন্ন বোর্ড পরীক্ষায় যাতে রোমান হরফে ককবরক লেখা যায় তারা সেই দাবিতে মুহুর্মুহু শ্লোগান দিতে থাকে।তিপ্রা মথার ছাত্র যুবরা বিজেপি'র বিধায়ককে ঘিরে বিক্ষোভ দেখাতে থাকে।পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠে।এরপর অবশ্য পুলিশী হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।বিনা অনুমতিতে শহরে বিক্ষোভ প্রদর্শন ও সরকারি কর্মসূচিতে বাধাদানের অভিযোগে পুলিশ ৬০ জন ছাত্র-যুবককে আটক করে এডিনগর পুলিশ মাঠে নিয়ে যায়।এই ঘটনায় সামাজিক মাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে তিপ্রা মথার সুপ্রিমো প্রদ্যোত কিশোর বলেন,ককবরক দিবস উদযাপনের দিন ছাত্রছাত্রীদের উপর পুলিশের বল প্রয়োগ ঠিক হয়নি।তিনি বলেন, রাজপথে ড্রাগ কারবারীরা ঘুরছে, পুলিশ ব্যবস্থা নিতে পারে না।কিন্তু ছাত্রছাত্রীরা যখন তাদের ভবিষ্যত সুরক্ষায় পথে নেমেছে তখন পুলিশ তাদের আটক করছে।প্রদ্যোত কিশোর জোর দিয়ে বলেন, রোমান লিপিতে ককবরক ভাষার পরীক্ষার অধিকার আমাদের দিতেই হবে। জনজাতি ছাত্রছাত্রীদের বাংলা ভাষায় পরীক্ষা দিতে বাধ্য করলে তীব্র প্রতিবাদ হবে।আমরা রুখে দাঁড়াব। তিনি বলেন, বাংলা ভাষাকে আমরা যথেষ্ট সম্মান করি।আমরা কোনও ভাষারই বিরোধী নই।কিন্তু জনজাতিদের উপর অন্য ভাষা চাপিয়ে দিলে তা বরদাস্ত করা হবে না।জনজাতিদের ভবিষ্যত সুরক্ষার জন্য রোমান লিপি চালু করতেই হবে।মথা সুপ্রিমো প্রদ্যোত হুঁশিয়ারির সুরে বলেন, ককবরকের রোমান লিপির জন্য আগামী দিনেও তীব্র আন্দোলন হবে।কেউ ছাত্রছাত্রীদের রুখতে পারবে না।এই ইস্যুতে তিনি ছাত্রছাত্রীদের পাশাপাশি অভিভাবকদেরও পথে নামার আহ্বান জানান।

এখানে উল্লেখ করা যায় যে, তিপ্রা মথা শুরু থেকেই ককবরকের রোমান লিপির জন্য আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে।মথা বিজেপি জোট সরকারের শরিক হবার পরও তারা নানা ইস্যুতে আন্দোলন করে যাচ্ছে।তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে রোমান লিপির দাবি।বামফ্রন্টের আমলে ককবরক ভাষাকে রাজ্যের অন্যতম সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও লিপির বিষয়টি কিন্তু ঝুলে আছে তখন থেকেই। জনজাতি ভিত্তিক আঞ্চলিক দল সমূহ অবশ্য বরাবরই ককবরকের রোমান লিপির দাবি জানিয়ে আসছে। বামফ্রন্টের আমল থেকে বাংলার পাশাপাশি রোমান লিপিতেও ককবরক লেখা হয়ে আসলেও বাম নেতৃবৃন্দ বরাবরই ককবরকের বাংলা লিপির পক্ষেই সওয়াল করে আসছিলেন।সিপিএম নেতা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী দশরথ দেবও ককবরকের বাংলা লিপির পক্ষে অনেক লেখালেখি করেছেন,তাত্ত্বিক আলোচনা করেছেন।যাইহোক,ত্রিপুরাতে বর্তমানে ককবরকের লিপি বিতর্ক আবার তেজী হয়ে উঠছে।বিজেপি জোট সরকারের শরিক তিপ্রা মথা রাজ্যের আগামী জেলাপরিষদ নির্বাচনের আগে ককবরকের লিপি ইস্যুতে মাঠে নেমে পড়েছে।একদিকে যখন জেলা পরিষদের নির্বাচনে তিপ্রা মথা ও বিজেপি দু'দলই পৃথক পৃথক ভাবে লড়া এবং দু'দলের পক্ষেই পরিষদ গঠনের দাবি করা হচ্ছে তখন আবার ককবরকের লিপি ইস্যুতেও বিতর্ক জমে উঠেছে।মথা বরাবর ককবরকের রোমান লিপির দাবি জানিয়ে আসলেও রাজ্য সরকারের পক্ষে এ বিষয়ে জোরালো ভাবে তেমন কিছু বলা হয়নি।স্পর্শকাতর এই প্রসঙ্গটি রাজ্য সরকার এতদিন এড়িয়ে গেছে বললে ভুল বলা হবে না।কিন্তু এখন রাজ্য মুখ্যমন্ত্রী ডাঃমানিক সাহা ককবরকের জন্য যে কোনও ভারতীয় ভাষার লিপির পক্ষে সওয়াল করছেন। এর প্রত্যুত্তরে মথা সুপ্রিমো প্রদ্যোত কিশোর বলেছেন, ককবরকের লিপির বিষয়টি ককবরক ভাষাভাষিদের উপর ছেড়ে দিলেই ভালো।যারা ককবরকে লেখেন, কথা বলেন তারাই ঠিক করবেন তাদের ভাষার জন্য কোন লিপি তারা গ্রহণ করবেন। মুখ্যমন্ত্রী ডাঃসাহা ককবরকের লিপি ইস্যু প্রসঙ্গে এক সভায় মথার উদ্দেশ্যে বলেন, এর জন্য আন্দোলনের প্রয়োজন নেই। নিজেরাই লিপি তৈরির কাজটি করুন। চাকমা জনজাতি গোষ্ঠীর মানুষ নিজেরাই তা করছে।এদিকে,রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার লিপি ইস্যুতে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে নতুন বিতর্ক সৃষ্টির অভিযোগ করেছেন। লিপি বিতর্কের আড়ালে জনজীবনের সমস্যাকে আড়াল করার অভিযোগ এনে তিনি লিখেছেন, রোমান হরফের বিষয়টি সামনে এনে তিপ্রা মথা উপজাতি জনমনে যখন আবেগ ও উত্তেজনার পারদ চড়াতে চাইছে তখন মুখ্যমন্ত্রী এর বিরোধিতা করে ককবরকের জন্য রোমান লিপি গ্রহণের কথা বলে আবার নতুন বিতর্কের ক্ষেত্র তৈরি করছেন। লিপি ইস্যুতে তদানীন্তন বামফ্রন্ট সরকারের অবস্থান প্রসঙ্গে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী শ্রীসরকার বলেন, বাংলা হরফে ককবরক লিখতে হবে বামফ্রন্ট সরকার যেমন বাধ্যতামূলক এমন কোনও অবস্থান নেয়নি,তেমনই রোমান হরফের বিরোধিতাও করেনি।এদিকে,বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার ককবরকের জন্য দেবনাগরী লিপি চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে কংগ্রেস এই অভিযোগ করে এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।কংগ্রেস থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে,একশো বছর বাংলা লিপিতে লেখার পর ককবরকের একাংশ রোমান লিপিতে লেখা শুরু হয় এবং বর্তমানে এটি বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে পড়ানো হচ্ছে।বিবৃতিতে আরও বলা হয়,ককবরক ভাষার লিপির বিষয়ে বিশিষ্ট ভাষাবিদ পবিত্র সরকার কমিশনের মতামত অনুসারে ককবরক ভাষাভাষিরাই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।কিন্তু বিজেপি সরকার দেবনাগরী লিপির নামে হিন্দি চাপিয়ে দিতে চাইছে। কংগ্রেস থেকে ককবরকের রোমান লিপি চালু সহ ভাষাটিকে অষ্টম তপশিলে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানানো হয়।

সব মিলিয়ে ত্রিপুরায় ককবরকের লিপি বিতর্ক এখন তুঙ্গে উঠছে।লিপি ইস্যুতে তিপ্রা মথা সুপ্রিমো তিপ্রাসাদের অধিকার রক্ষায় আন্দোলন অব্যাহত রাখার বার্তা দিয়ে বলেছেন, ককবরক ভাষা ও সংস্কৃতি আমাদের পরিচয়।একে রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। ককবরক দিবস উদযাপনের শোভাযাত্রায় বাংলায় প্ল্যাকার্ড ঝোলানোর ঘটনাকেও ককবরক ভাষা-সংস্কৃতির অপমান হিসেবে উল্লেখ করেছেন মথা সুপ্রিমো।ভাষা ও লিপি ইস্যু ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ মোটেই নতুন কোনও বিষয় নয়।মাঝে মাঝে দক্ষিণের একাধিক রাজ্য সোচ্চার হয়ে উঠে হিন্দির বিরুদ্ধে।অভিযোগ উঠে হিন্দি চাপিয়ে দেয়ার। মহারাষ্ট্রেও মাঝে মাঝে তেজী হয়ে উঠে মারাঠি বনাম হিন্দি ইস্যু।তাই আগামী দিনগুলোতে ত্রিপুরা উপজাতি স্বশাসিত জেলা পরিষদ নির্বাচনের আগে যে ককবরকের লিপি বিতর্ক আরও তুঙ্গে উঠবে তা অনুমান করতে মোটেই অসুবিধা হয় না।

আরও পড়ুন...


Post Your Comments Below

নিচে আপনি আপনার মন্তব্য বাংলাতেও লিখতে পারেন।

বিঃ দ্রঃ
আপনার মন্তব্য বা কমেন্ট ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষাতেই লিখতে পারেন। বাংলায় কোন মন্তব্য লিখতে হলে কোন ইউনিকোড বাংলা ফন্টেই লিখতে হবে যেমন আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড (Avro Keyboard)। আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ডের সাহায্যে মাক্রোসফট্ ওয়ার্ডে (Microsoft Word) টাইপ করে সেখান থেকে কপি করে কমেন্ট বা মন্তব্য বক্সে পেস্ট করতে পারেন। আপনার কম্পিউটারে আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড বাংলা সফ্টওয়ার না থাকলে নিম্নে দেয়া লিঙ্কে (Link) ক্লিক করে ফ্রিতে ডাওনলোড করে নিতে পারেন।

Free Download Avro Keyboard

Fields with * are mandatory





Posted comments

Till now no approved comments is available.