উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সম্ভাবনার অভাব নেই, সমস্যা বাস্তবায়নে: কলকাতার ইউএস–ইন্দো-প্যাসিফিক ডায়লগে স্পষ্ট বার্তা
জয়ন্ত দেবনাথ
January 17, 2026
১৬ জানুয়ারি কলকাতায় US Consulate General Kolkata এবং Observer Research Foundation (ORF)-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত US Strategic Framework for the Indo-Pacific : North Eastern Dialogue, Kolkata Chapter- শীর্ষক আলোচনায় ত্রিপুরা সহ সমগ্র উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও নীতিগত বাস্তবতার এক গভীর ও খোলামেলা মূল্যায়ন উঠে আসে। এই আলোচনায় উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে আগত সাংবাদিক, গবেষক, শিল্পপতি ও বণিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা প্রায় একবাক্যে স্বীকার করেন যে, এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ, ভৌগোলিক অবস্থান ও মানবসম্পদের কোনও অভাব নেই। অভাব রয়েছে মূলত কার্যকরে সদিচ্ছা, সরকারি প্রকল্প ও সিদ্ধান্ত গুলির সময়োপযোগী বাস্তবায়ন এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক প্রচারের।
আলোচনায় অংশগ্রহণকারী আমি সহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অধিকাংশ প্রতিনিধিরা—ত্রিপুরা ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পর্যটন বিকাশের বিপুল সম্ভাবনার পাশাপাশি বাঁশ ও রাবার ভিত্তিক শিল্প, প্রাকৃতিক গ্যাস, জলবিদুত, কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াকরণ শিল্প এবং মায়ানমার, নেপাল, বাংলাদেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের বাস্তব সম্ভাবনার কথা বিশেষভাবে তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তাঁরা জোর দিয়ে বলেন যে, এই সম্ভাবনা গুলিকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে সীমান্তবর্তী দেশ ও অঞ্চলে স্থিতিশীল ও স্বাভাবিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিশ্চিত করা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলা এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সক্রিয়তা আরও বাড়ানো একান্ত জরুরি।
এই ডায়লগে আরও স্পষ্টভাবে উঠে আসে যে, কেন্দ্রীয় সরকারের একাধিক উন্নয়নমূলক প্রকল্প ও স্কিম কাগজে-কলমে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য বরাদ্দ থাকলেও, বাস্তবে সেগুলির সুফল পেতে গিয়ে নতুন উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র শিল্পোদ্যোগী এবং স্থানীয় বেকার যুবক-যুবতীরা জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, পর্যাপ্ত তথ্যের অভাব এবং বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতির মুখে পড়ছেন। একইভাবে, সড়ক, রেল, বন্দর, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অন্যান্য পরিকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে বহু গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় প্রকল্প বিভিন্ন রাজ্যে অত্যন্ত ধীরগতিতে অগ্রসর হচ্ছে, এই অভিযোগও আলোচনায় উঠে আসে।
এই প্রেক্ষাপটে আলোচনায় অনেকেই বলছেন যে, শুধুমাত্র নীতি প্রণয়ন বা প্রকল্প ঘোষণা করলেই উন্নয়ন নিশ্চিত হয় না। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষের বাস্তব সমস্যা, মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা সরাসরি শোনার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার এবং সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকার গুলির উচিত নিয়মিত ও ঘন ঘন পরামর্শমূলক সভা ও সংলাপের আয়োজন করা। জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনও উন্নয়ন পরিকল্পনাই দীর্ঘস্থায়ী ও কার্যকর হতে পারে না।
কলকাতার আমেরিকান সেন্টারের আমন্ত্রণে এসে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাংবাদিক, গবেষক ও বণিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা যে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও মতামত তুলে ধরেছেন, সেগুলি ভারত সরকারের শীর্ষ আধিকারিক এবং নীতি নির্ধারকদের গুরুত্ব সহকারে শোনা উচিত। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্য গুলিতে বিনিয়োগ আকর্ষণ, প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিবন্ধকতা এবং প্রশাসনিক জটিলতা গুলি সরাসরি তুলে ধরার জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও নিয়মিত প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা অত্যন্ত প্রয়োজন।
এর ফলে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য স্তরের নীতি নির্ধারকদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সরাসরি সংলাপ স্থাপন সম্ভব হবে এবং প্রাপ্ত মতামতের ভিত্তিতে নীতি ও প্রকল্প গুলিতে সময়োপযোগী সংশোধন আনা অনেক সহজ হবে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে যদি সত্যিকার অর্থে ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট পলিসি’ এবং ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে হয়, তবে নিরবচ্ছিন্ন সংলাপ, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের কোনও বিকল্প নেই।
মানুষের কথা না শুনে, মাঠের বাস্তবতা না বুঝে কোনও উন্নয়ন পরিকল্পনা সফল হতে পারে না—এই মৌলিক সত্যটি কলকাতায় অনুষ্ঠিত এই ইউএস–ইন্দো-প্যাসিফিক ডায়লগে অংশ নিয়ে নতুন করে উপলব্ধি করলাম। আমার দৃঢ় আশা, আগামী দিনে কেন্দ্রীয় সরকার এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রতিটি রাজ্য সরকার এই বিষয়গুলিকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবেন এবং নিয়মিত, প্রাতিষ্ঠানিক ও ফলপ্রসূ পরামর্শমূলক বৈঠকের মাধ্যমে এই অঞ্চলের মানুষের কণ্ঠস্বরকে নীতি নির্ধারণের মূল স্রোতে যুক্ত করবেন। তবেই উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রকৃত সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ পাবে এবং এই অঞ্চল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে তার ন্যায্য ও প্রাপ্য স্থান অর্জন করতে সক্ষম হবে। ( লেখক জয়ন্ত দেবনাথ একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও ত্রিপুরাইনফো-র সম্পাদক)
আরও পড়ুন...