“পোস্টমডার্ণ নারীবাদ মানে সর্বপ্রথম নারীর চিন্তার স্বাধীনতা।”
সৌম্যদীপ দেব
January 8, 2026
কথাকার পদ্মশ্রী মজুমদারের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় সৌম্যদীপ দেব।
সৌম্য: এই প্রবল ব্যক্তি প্রচারের সময়ে দাঁড়িয়েও আপনি বরাবর আড়াল প্রিয়৷ নিজেকে নাগরিক জীবনের ফলিত সূর্যের থেকে দূরেই রেখেছেন। কেনো এই স্বেচ্ছা অন্তরাল?
পদ্মশ্রী: অন্তরালে থাকলে আজকের এই সাক্ষাৎকার হতো না। অন্তরালে নয়। দৌড়ঝাঁপে নেই। সে বড় ক্লান্তিকর ব্যাপার। তার চেয়ে বরং অবসরের বিকেলে ধীর পায়ে হাঁটা অনেক বেশি আনন্দের। আসলে আমি নিজের মতো সময় কাটাতে ভালোবাসি। বলার চেয়ে বেশি ভালোবাসি দেখতে, শুনতে ও লিখতে। তাই মঞ্চে নয় , দর্শকাসনেই স্বচ্ছন্দ বোধ করি। আর 'নাগরিক জীবনের ফলিত সূর্য'র কথা বলছিলেন— সে বিষয়ে বলব যে প্রাকৃতিক জীবনের সূর্যের আলোকেই স্পষ্ট হয়ে উঠে বোধিবৃক্ষ।
সৌম্য: পদ্মশ্রী মজুমদার কখন, কীভাবে লেখালেখিতে এলেন? এই জীবনের পথ ভাঙার শুরুটি কেমন ছিল?
পদ্মশ্রী: কুমারঘাটে দেও নদীর কোলে বড় হয়ে ওঠা আমার। কুমারঘাট তখনও শহর হয়ে ওঠেনি। দেও গভীর খরস্রোতা। নদীর বুকে নিরবিচ্ছিন্ন ঢেউ,দুই তীরের সবুজ আর হরেক পাখি,প্রজাপতি,ফড়িং এদের মনের ভাষা পড়তে গিয়ে ছড়া দিয়েই লেখার শুরু। গল্প এসেছে কিছুটা পরে।
সৌম্য : জুম, রঙ্গিলা ও অন্যান্য গল্প, কৃষ্ণাবয়ব এযাবৎ আপনার গল্প সংকলন। কী বলতে চান গল্পে? নতুন কী দেখাতে চান? উন্মোচনটি কীসের?
পদ্মশ্রী: প্রতিটা গল্পেই নিজেকে ভেঙেছি বারবার। এক 'আমি'র ভেতরে কতটা 'আমি' ঘাপটি মেরে বসে থাকে সেটাই দেখতে চেয়েছি। এই অন্বেষণের তো শেষ নেই। যতবার ভেঙেছি, নতুন মুখ নতুন বার্তা নিয়ে এসেছে। তবে সামগ্রিক ভাবে তো একটাই বিষয়— অন্বেষণ, যা প্রত্যেকের ভেতর নিরন্তর চলছে জ্ঞানে-অজ্ঞান।
সৌম্য: ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য পড়ান, লেখালেখি বাংলা ভাষায়। একটা বৈপরীত্য তো আছেই৷ এই নিয়ে কোনো বিরল অভিজ্ঞতা যা আপনি শেয়ার করতে চান পাঠকদের উদ্দেশ্যে।
পদ্মশ্রী: ভাষার বৈপরীত্য ছাড়া আর কোনো বৈপরীত্য নেই। শুধু ইংরেজী বা বাংলা বলে কথা নয়,পৃথিবীর যে কোনো ভাষার সাহিত্যের আবেগ-অনুভূতি তো একই কথা বলে। না,তেমন কোনো বিরল অভিজ্ঞতা নেই এ বিষয়ে।
সৌম্য: উত্তরপূর্বের এক সাহিত্য সমালোচক আপনার ‘দেওনদীর জল’ উপন্যাস নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন “বুনন, শব্দচয়ন উপন্যাসের অন্যতম অলংকার। উপন্যাসের কেন্দ্রে একটি নদী, নাম দেও। বৃহৎ অঞ্চল জুড়ে প্রবাহিত এই নদী। এই দেও মিলে গেছে মনু নদীতে। দেখার বিষয় হল কাঞ্চনপুরের জম্পুইটাঙ পাহাড় থেকে দেও নদীর উৎপত্তি। আর শাখানটাং থেকে মনু নদীর উৎপত্তি ঘটেছে। অথচ সিদং ছড়ার শাখান ভেদ করে মনু নদীর সঙ্গে সঙ্গম রচনা করেছে দেও। মিলে গেছে দুটো জল ধারা। দুটি জীবন, দুটি প্রাণ। উপন্যাসের পরতে পরতে লোকসংস্কৃতির বয়ন করেছেন ঔপন্যাসিক। লোকসংস্কৃতি তো আসলে একটি জনগোষ্ঠীর অবিভাজ্য উত্তরাধিকার। আর সিলেটি লোকসংস্কৃতিকে ওপার থেকে এপারে আসা দেশভাগের বলি হওয়া মানুষ দেওয়ের কোলে আশ্রয় নিয়ে লালন করেছে বাঁচার তাগিদে। মিথ- লোকবিশ্বাস-খনার বচন-গ্রাম্য আচার -সংস্কার -কুসংস্কার -অন্ধবিশ্বাস -আঞ্চলিকতার উপাদান সঞ্জাত এক অনবদ্য আখ্যান ‘দেওনদীর জল’। — লোকসংস্কৃতি বলা যায় এই উপন্যাসের প্রাণ হয়ে উঠেছে। কতটা ক্ষেত্র সমীক্ষা প্রয়োজন হয়েছিল এই উপন্যাসের জন্য?
পদ্মশ্রী: সারা জীবন ধরে চলছিল ক্ষেত্র সমীক্ষা। ছোটবেলা মা যখন কথার মাঝখানে খনার বচন বলতেন এর মানে জেনে নিতাম মা'য়ের কাছে। ডাইরিতে লিখে রাখতাম। মজার কথা হল আমার মা শ্রীহট্টীয় শ্লোক বলে বকুনি দিতেন। সবটার অর্থ বুঝতাম না। পরে মা'র মন শান্ত হলে এর অর্থ জেনে নিতাম। শ্লোক সহ লিখে রাখতাম।মা হেসে ফেলতেন।ব্রত-পুজোতে মায়ের সাথে থেকেছি। লক্ষ্য করতাম মা কীভাবে আচার-অনুষ্ঠান করছেন। তখন জানতাম না 'দেও নদীর জল' লিখব। যখন লিখতে গেছি তখনও অনেক ক্ষেত্র সমীক্ষা করতে হয়েছে।
সৌম্য: ‘দেওনদীর জল’ উপন্যাসের চরিত্রগুলোও ভীষণরকমের বাস্তব। এগুলো কী নিছক কাল্পনিক? শুধুই মর্মচক্ষে দেখা? চর্মচক্ষে দেখা নয়?
পদ্মশ্রী: মর্মচক্ষু ও চর্মচক্ষুর সম্মিলিত নিরীক্ষণ। একমাত্র 'লাউ গোঁসাই' চরিত্র পুরোটাই মর্মচক্ষুতে দেখা। এরকম একটা চরিত্র আমার স্বপ্ন-চরিত্রও বলতে পারেন। এর সমসাময়িক দৃষ্টিভঙ্গীর চরিত্র চর্মচক্ষুতে দেখেছি অনেক পরে। উপন্যাসটাই তাকে টেনে আনল কি-না কে জানে!
সৌম্য: পোস্টমডার্ণ নারীবাদ বিষয়টি কীভাবে দেখেন?
পদ্মশ্রী: যে অর্ধেক আকাশের কথা ভেবে পোস্টমডার্ণ নারীবাদ বিষয়টা শুরু হয়েছিল সেখান থেকে বিষয়টা শুধু ফ্যাশনেবল পোশাক আর টেকনোলজির দিকেই যাচ্ছে বলে মনে হয়। পোস্টমডার্ণ নারীবাদ মানে সর্বপ্রথম নারীর চিন্তার স্বাধীনতা।একজন পোস্টমডার্ণ নারী জীবনের যে কোনো প্রতিকূল অবস্থার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সম্পূর্ণ স্বনির্ভর ও স্বাধীনভাবে জীবনমুখী সিদ্ধান্ত নেবেন— এটাই হওয়ার কথা কিন্তু প্রতিকূলতা সামলে উঠতে না পেরে অনেকেই জীবন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
সৌম্য: কী মনে হয় একালের সাহিত্যে সংকট কোথায়? কোথায় ক্লাসিক সাহিত্য নির্মাণের পথ অবরুদ্ধ হচ্ছে?
পদ্মশ্রী: শাশ্বতের অনুসন্ধানে যে জীবনবোধ থাকা প্রয়োজন তা আজকালকার ব্যক্তি জীবনে অনেকটাই অনুপস্থিত। জীবনের প্রতিটা পরত খুলে দেখতে হয় আর বলতে হয় 'এহো বাহ্য,এহো বাহ্য,আগে কহো আর।'
সৌম্য: এই সময়ে যারা নতুন লেখালেখি করছেন তাদের মধ্যে কাদের লেখায় সম্ভাবনা দেখতে পান?
পদ্মশ্রী: আমি কারও নাম করে বলছি না, তবে অনেকের মধ্যে অমিত সম্ভাবনা রয়েছে। দরকার শুধু অধ্যবসায়।
সৌম্য: নতুন কী লিখছেন? নতুন কী পড়ছেন আপনার পাঠকদের উদ্দেশ্যে বলুন?
পদ্মশ্রী: অণুকবিতা, গদ্য ও উপন্যাস সবটাই পাশাপাশি লেখা চলছে। অনেক কিছুই পড়ছি। কখনো ক্ল্যাসিক সাহিত্য আবার কখনো হালফিলের পূজাসংখ্যা।
অনেক কথা হল। ধন্যবাদ আপনাকে।
আরও পড়ুন...