এঞ্জেল,অশান্ত কার্বি, ত্রিপুরায় লিপি ইস্যু

পান্নালাল রায়

January 7, 2026

দেরাদুনে ত্রিপুরার এক ছাত্রের জাতি বিদ্বেষের শিকারের অভিযোগে মৃত্যুর ঘটনায় দেশ জুড়েই তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।দেশের অন্যান্য অঞ্চলে উত্তর পূর্বাঞ্চলের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে এ ধরণের নিগ্রহের ঘটনায় স্হানীয় বিভিন্ন সংস্থা প্রবল ভাবে সোচ্চার হয়েছে। এদিকে অসমের কার্বি আংলঙ-এ অকার্বিদের জোরপূর্বক উচ্ছেদের ঘটনায় দু'জনের মৃত্যু সহ বেশ ক'জন আহত হয়েছে। কার্বি আলঙ-এ অকর্বিদের জনসংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পাওয়ায় তাদের উচ্ছেদের দাবি ঘিরেই অশান্ত হয়ে উঠে পশ্চিম কার্বি আলঙ। এদিকে ত্রিপুরার ককবরকের জন্য লিপি আন্দোলন আবার তেজী হবার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

সম্প্রতি ত্রিপুরার এক ছাত্র এঞ্জেল চাকমা উত্তরাখণ্ডের দেরাদুনে নিগ্রহের শিকার হয়ে গুরুতর আহত হয় এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থাতে তার মৃত্যু ঘটে।এই ঘটনায় ত্রিপুরা তথা উত্তর পূর্বাঞ্চল সহ গোটা দেশেই তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ সহ বিভিন্ন সংগঠন ঘটনার তীব্র নিন্দা করে এ ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন। ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রীও উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছেন এবং মুখ্যমন্ত্রী পর্যায়ে এই আলোচনার পর পুলিশ যথারীতি নড়েচড়ে বসেছে।ঘটনার অভিযোগে দেরাদুন পুলিশ এ পর্যন্ত পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তবে মূল অভিযুক্ত নেপালের বাসিন্দা নেপালে পালিয়ে গেছে বলে পুলিশের ধারণা।তাকে ধরার জন্যও পুলিশ চেষ্টা করছে বলে জানানো হয়েছে।পঁচিশ হাজার টাকা পুরস্কারের কথাও ঘোষণা করা হয়েছে।এদিকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এই ঘটনায় দেরাদুনের পুলিশ ও প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দিয়ে জাতিগত বর্ণবিদ্বেষী অভিযোগ সমূহ বিস্তৃত তদন্ত করে রিপোর্ট দিতে বলেছে।দেরাদুনের সিনিয়র পুলিশ সুপার অবশ্য দাবি করেছেন এঞ্জেলের মৃত্যুর সঙ্গে জাতিগত বিদ্বেষমূলক মন্তব্যের কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি।উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী পুস্কর সিং ধামি এঞ্জেলের পিতার সঙ্গেও টেলিফোনে কথা বলে গভীর শোক প্রকাশ করে বলেছেন,ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।তিনি আরও বলেন, সারা দেশ থেকেই বিপুল সংখ্যক ছাত্রছাত্রী উত্তরাখণ্ডে পড়তে আসে।কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ভাবে এঞ্জেলদের সঙ্গেই এ রকম ঘটল। স্বাভাবিকভাবেই এই ঘটনা ঘিরে ত্রিপুরার চাকমা সম্প্রদায় ও সমস্ত অংশের জনজাতি সম্প্রদায় সহ সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।ট্রাইবেল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন অর্থাৎ টিএসইউ এই ঘটনায় জড়িত দোষীদের কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছে।তারা বলেছে দেরাদুনের ঘটনা প্রমাণ করে দেশের নানা প্রান্তে জনজাতি ও উত্তর পূর্বাঞ্চলের ছাত্রছাত্রীরা এখনও গুরুতর নিরাপত্তাহীনতার সম্মুখীন হচ্ছে।তুইপ্রা স্টুডেন্টস ফেডারেশনও দেশে উত্তর পূর্বাঞ্চলের ছাত্রছাত্রীদের নিরাপত্তার দাবি তুলেছে।এঞ্জেল চাকমা খুনের তীব্র প্রতিবাদ ও সংশ্লিষ্ট দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে আগরতলা সহ বিভিন্ন জায়গায় মোমবাতির মিছিল হয়েছে।ত্রিপুরা হিউম্যান রাইটস অর্গানাইজেশনও এঞ্জেল হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা করে সংশ্লিষ্ট দুষ্কৃতীদের উপযুক্ত বিচার ও শাস্তি সুনিশ্চিত করার জন্য উত্তরাখণ্ড সরকারের কাছে জোরালো দাবি জানিয়েছে।ইতিপূর্বেও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে উত্তর পূর্বাঞ্চলের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে সংঘটিত এ ধরণের ঘটনার বিষয় দেরাদুন প্রসঙ্গে সামনে আসছে।দেরাদুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে জনজাতি ভিত্তিক আঞ্চলিক দলের ঐক্যমঞ্চ 'ওয়ান নর্থ ইস্ট'-এর প্রয়োজনীয়তার উপরও গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে।মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী কনরাড সাঙমা, ত্রিপুরার তিপ্রা মথা সুপ্রিমো প্রদ্যোত কিশোর প্রমুখ এই ঘটনার বিরুদ্ধে প্রবল ভাবে সোচ্চার। সামাজিক মাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ছে ক্ষোভ।মথা সুপ্রিমো প্রদ্যোত কিশোর অবশ্য বলেছেন, এঞ্জেল হত্যাকাণ্ডের ঘটনা রাজনৈতিক নয়,জাতিবিদ্বেষও এর সঙ্গে যুক্ত নয়। এই ঘটনায় দোষীদের কঠোর শাস্তি দাবি করে তিনি বলেছেন,এঞ্জেল হত্যাকাণ্ড ঘিরে আমাদের আন্দোলনের ফলে সারা দেশের টনক নড়েছে।এঞ্জেল হত্যাকাণ্ডের ন্যায় বিচারের দাবিতে রাজধানী নয়াদিল্লিতেও উত্তর পূবের ছাত্রছাত্রীরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে। সব মিলিয়ে ত্রিপুরার ছাত্র হত্যার ঘটনায় সারা দেশেই তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।ভবিষ্যতে যাতে এ ধরণের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয় তা সুনিশ্চিত করতে হবে। আমাদের এই দেশে যে নানা ধর্ম আর বর্ণের মানুষের বসবাস,আর সবার ভাষা-সংস্কৃতি নিয়েই যে আমাদের বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের মহান সংস্কৃতি,এই উপলব্ধির ঘাটতি মেটাতে সকল অংশের মানুষকেই আন্তরিকতার সঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। তবেই হয়তো এঞ্জেলের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ সম্ভব হবে।

এবার আসা যাক অসমের কার্বি আংলঙের প্রসঙ্গে।সম্প্রতি এই পাহাড়ি জেলাটি উচ্ছেদের ঘটনা ঘিরে হিংসায় উন্মত্ত হয়ে উঠেছিল। অকার্বিদের উচ্ছেদের দাবি ঘিরে সম্প্রতি কার্বি আংলঙের খেরনিতে হিংসা ছড়িয়ে পড়ে।নিহত হয় দু'জন,আহত হয় কয়েকজন।হিংসাত্মক ঘটনা সামাল দিতে গিয়ে আহত হয় ৩৮ জন পুলিশ কর্মী।এমনকি অসমের খোদ ডিজিপি-কেও হিংসা কবলিত এলাকায় ছুটে যেতে হয়।অকার্বিদের উচ্ছেদের দাবিতে অনশন ধর্মঘট ঘিরে হিংসাত্মক ঘটনার সূত্রপাত বলে জানা যায়।মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, পশ্চিম কার্বি আংলঙে অকার্বিদের জনসংখ্যা কার্বিদের তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।কার্বিদের সংগঠন তাই উচ্ছেদের দাবি জানিয়ে আসছে।কিন্তু প্রতিবাদকারীরা যে ভাবে অকার্বিদের বিতাড়ণ চাইছেন তাতে সমস্যার কোনও সমাধান হবে না। আলাপ আলোচনার মাধ্যমেই এই সমস্যার সমাধান করতে হবে। অসমের প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি গৌরব গগৈ বলেছেন, আগুন জ্বালিয়ে প্রতিবাদ মানা যায় না। হিংসা কোনও প্রতিবাদের পথ হতে পারে না।অহিংস প্রতিবাদে আমাদেরও সমর্থন থাকবে। ডিমা হাসাও পিপলস পার্টির নেতা ড্যানিয়েল লাংথাসা বলেন, কার্বি আংলঙ যা ঘটছে তা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। তাঁর অভিযোগ, অসম সরকার ও কার্বি শায়ত্ব শাসিত পরিষদ আগুন নিয়ে খেলা করছে।উল্লেখ করা যায় যে,কার্বি আংলঙ ও পশ্চিম কার্বি আংলঙ-এ পিজিআর ও ভিজিআর জমিতে 'অবৈধ' ভাবে জমি দখলদারদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদের দাবিতে উত্তাল গোটা জেলা। লাংথাসার অভিযোগ,রাজ্য সরকার ভোটের রাজনীতি করে জাতিতে জাতিতে সমাজটাকে ভাগ করে দিতে চাইছে।তাঁর মতে কার্বি আংলঙ-এর ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে গরীব শ্রেণীর মানুষের। তাঁর প্রশ্ন যেখানে অসম জুড়ে অবৈধ জমি দখলের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে,সেখানে কার্বি আংলঙ-এ যারা অবৈধ ভাবে জমি দখল করে রেখেছে তাদের উচ্ছেদের জন্য স্হানীয় মানুষের অনশন করতে হবে কেন!যাইহোক, কার্বি আংলঙ-এ শান্তি ফিরিয়ে আনতে ত্রিপাক্ষিক বৈঠক সহ প্রশাসনিক স্তরে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।বর্তমান বছরের প্রথম দিকেই অসমের বিধানসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ভোটের আগে যে এ ধরণের অশান্তির ঘটনা আরও নানা জায়গায় ঘটতে থাকবে সেই আশঙ্কা মোটেই উড়িয়ে দেয়া যা না।

এদিকে ত্রিপুরা উপজাতি স্বশাসিত জেলা পরিষদের আগামী নির্বাচন ঘিরে ত্রিপুরার রাজনৈতিক পরিস্থিতিও উত্তপ্ত হতে শুরু করেছে।এখন পর্যন্ত যা চিত্র সামনে আসছে তাতে দেখা যাচ্ছে এই নির্বাচনে বিজেপি এবং তিপ্রা মথা পৃথক পৃথক ভাবেই লড়বে এবং দুই দলই একক ভাবে পরিষদ গঠনের দাবি করছে।মুখ্যমন্ত্রী ডাঃমানিক সাহা দাবি করেছেন জেলা পরিষদের নির্বাচনে বিজেপি জয়ী হবে। পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী জোট সঙ্গী তিপ্রা মথাকেও সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, মথা আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে বলে তিনি আশা করেন।কোনও শক্তিই ক্ষমতা দখল থেকে বিজেপি-কে দূরে রাখতে পারবে না। মুখ্যমন্ত্রী বিভিন্ন জায়গায় রাজনৈতিক সংঘর্ষেরও তীব্র নিন্দা করেছেন।উল্লেখ্য, তিপ্রা মথাও জেলা পরিষদের আসন্ন ভোটে ব্যাপক সাফল্য লাভের দাবি জানিয়ে আসছে।এই রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্যেই ককবরকের লিপি আন্দোলন ফের তেজী হয়ে উঠার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।ককবরকের জন্য মুখ্যমন্ত্রী যে কোনও ভারতীয় ভাষার লিপির পক্ষে সওয়ালের প্রত্যুত্তরে মথা সুপ্রিমো প্রদ্যোত কিশোর বলেন,ককবরকের লিপির বিষয়টি ককবরক ভাষাভাষিদের উপর ছেড়ে দিলেই ভাল। যারা ককবরকে লেখেন, কথা বলেন তারাই ঠিক করবেন কোন লিপি তারা গ্রহণ করবেন। তিপ্রা মথা বর্তমানে বিজেপি জোট সরকারের শরিক হলেও তারা কিন্তু নানা সময়ে নানা বিষয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ককবরকের জন্য রোমান লিপির আন্দোলন। ত্রিপুরা উপজাতি স্বশাসিত জেলা পরিষদ নির্বাচনের আগে এই লিপি ইস্যু যে আরও প্রকট হয়ে উঠবে এখনই তার ইঙ্গিত মিলছে।

আরও পড়ুন...


Post Your Comments Below

নিচে আপনি আপনার মন্তব্য বাংলাতেও লিখতে পারেন।

বিঃ দ্রঃ
আপনার মন্তব্য বা কমেন্ট ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষাতেই লিখতে পারেন। বাংলায় কোন মন্তব্য লিখতে হলে কোন ইউনিকোড বাংলা ফন্টেই লিখতে হবে যেমন আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড (Avro Keyboard)। আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ডের সাহায্যে মাক্রোসফট্ ওয়ার্ডে (Microsoft Word) টাইপ করে সেখান থেকে কপি করে কমেন্ট বা মন্তব্য বক্সে পেস্ট করতে পারেন। আপনার কম্পিউটারে আমার বাংলা কিংবা অভ্রো কী-বোর্ড বাংলা সফ্টওয়ার না থাকলে নিম্নে দেয়া লিঙ্কে (Link) ক্লিক করে ফ্রিতে ডাওনলোড করে নিতে পারেন।

Free Download Avro Keyboard

Fields with * are mandatory





Posted comments

Till now no approved comments is available.