জীবন যে রকম

মোসলেম উদ্দিন আহমেদ

October 10, 2026   

জীবন যে রকম
প্রতিদিনের মতো সূর্য ওঠার আগেই, খুব ভোরবেলা ফজরের নামাজ শেষ করে দিল্লির দিলশাদ গার্ডেন এলাকায় প্রাতর্ভ্রমণে বের হলাম। পূর্ব আকাশে সূর্যের আলো ফুটতে শুরু করেছে।সারা রাত এলাকা পাহারা দিয়ে নিজেদের দায়িত্ব পালন শেষে কুকুরগুলোও একে একে বিশ্রাম নিচ্ছে। তবে কে আসছে, কে যাচ্ছে, কারা যাতায়াত করছে, সেদিকেও তাদের সতর্ক দৃষ্টি রয়েছে।কোনও অপরিচিত মানুষকে দেখলে ঘেউ ঘেউ করে নিজেদের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে তার পরিচয় জানার চেষ্টা করে। কিন্তু আমাকে তারা চেনে বলে কোনও শব্দ করে না।
এদিকে প্রতিবেশী মহিলারাও দরজা জানালা খুলে বাড়ির সামনের অংশটুকু ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করছেন। কেউ ভগবানের নাম নিয়ে দিনের সূচনা করছেন, কেউ আবার সংসারের প্রাত্যহিক কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। ছোট ছোট দোকানদার, বিশেষ করে যাঁরা চা বিক্রি করেন, তাঁরা চুলায় আগুন জ্বালিয়ে জল গরম করতে বসিয়েছেন। পাশাপাশি চায়ের কাপ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পরিষ্কার করছেন। এভাবেই ধীরে ধীরে জেগে উঠছে শহর।
সোসাইটির গেটের নিরাপত্তারক্ষীরাও ভোরবেলায় গেট খুলে দেন। তাঁদের মধ্যে একজন বয়সের ভারে অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছেন। গেটের বাইরে বসা এক কলা বিক্রেতার সাহায্য নিয়ে তিনি গেট খোলেন। রাত এগারোটার পর এক নম্বর গেট বন্ধ হয়ে যায়। তিনজন নিরাপত্তারক্ষীর মধ্যে দুজন পালা করে বাকি সময়টুকু দায়িত্ব পালন করেন। তাঁদের প্রত্যেকের বয়সই ষাট থেকে পঁয়ষট্টির মধ্যে হবে।
এক নম্বর গেটের নিরাপত্তারক্ষীকে দেখলেই ‘নমস্তেজি’ বলে সম্ভাষণ জানাই। আমিও নমস্তেজি বলে কুশল বিনিময় করি I উনার নাম শ্রী বিনয় যাদব।বাড়ি বিহারে। ছোটবেলা থেকেই দিল্লির বিভিন্ন জায়গায় কাজ করতে করতে শেষ পর্যন্ত দিলশাদ গার্ডেনের রেলস্টেশনের কাছে একটি ভাড়াবাড়িতে থাকতে শুরু করেছেন।
এই বয়সেও কেন তিনি এত কষ্ট করে, ঠিকমতো না ঘুমিয়ে রাতের পর রাত ডিউটি করেন, তা জানতে চাইলাম। বিনয়জি একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘বাবুজি, ক্যা করনা! পাঁচ বেটা হ্যায়। সবকি শাদি হো গয়া। সবকুছ বহুত মহঙ্গা হো গয়া। উনকো খুদ চলনা ভি মুশকিল হ্যায়। ইসিলিয়ে কুছ পয়সা খুদ কামা লেতে হ্যায় তো হাম দোনো কা জরুরত চল রহা হ্যায়। হাম তো গরিব আদমি হ্যায়, উপরওয়ালে কি মরজি। আব ক্যা করেঁ!’
তাঁর কথায় জীবনের এক কঠিন বাস্তবতা ফুটে উঠল।বয়স হয়েছে, শরীর আর আগের মতো চলে না, তবু সংসারের প্রয়োজন মেটাতে কাজ করে যেতে হচ্ছে। বিশ্রাম নেওয়ার অবকাশ নেই, কারণ জীবনের দায়িত্ব থেকে অবসর নেওয়ার সুযোগ সবার ভাগ্যে জোটে না।
বিনয় যাদবের সঙ্গে যখন কথা বলছিলাম, তখন পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কলা বিক্রেতাও আমাদের কথা শুনছিলেন। মাঝেমধ্যে তিনিও আলোচনায় যোগ দিচ্ছিলেন। তাঁর বাড়িও বিহারের ভাগলপুর জেলার একটি গ্রামে। প্রায় কুড়ি-পঁচিশ বছর ধরে তিনি এই এলাকায় রয়েছেন। আগে দিল্লিতে ঠেলাগাড়ি চালানোর কাজ করতেন। কিন্তু এখন শরীরের আর সেই শক্তি সামর্থ নেই।তাই  মালিকের কাছ থেকে কিছু টাকা সুদে ধার নিয়ে কলা বিক্রি শুরু করেছেন।স্বামী-স্ত্রী মিলে কোনওমতে সংসার চালান। আনন্দ বিহার রেলস্টেশনের কাছে একটি ঝুপড়িতে তাঁদের বাস। তিনি আক্ষেপ করে বললেন, ‘বাবুজি, আজকাল বহুত মুশকিল হো রহা হ্যায়। লাভ বহুত কম হ্যায়, সামান কা দাম বহুত বাড় গয়া হ্যায়। ক্যা করেঁ, ভগবান কি মরজি!’
কথাগুলো শুনতে শুনতে মনে মনে ভাবলাম, এই বিশাল ভারতে যেখানে এক ক্ষুদ্র অংশের মানুষের হাতে সম্পদের পাহাড়, সেখানে অন্যদিকে বিরাট সংখ্যক মানুষ দিনরাত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেও সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকার উপযোগী উপার্জনটুকুও করতে পারছেন না। সত্যিই, এ যেন ভারতের এক নির্মম বাস্তব ছবি।  এই মানুষগুলোর খবরই বা কে রাখে? কবে তাঁদের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে, কে জানে! অথচ নির্বাচনের সময় এদের জন্য কতকিছু করার কথা রাজনৈতিক দলের নেতারা বলেন, পরে আর বিশেষ কিছু হয়না।নির্বাচন আসে যাই, এদের ভাগ্যের আর পরিবতন হয়না।   
ওলা কিংবা র‍্যাপিডোর অ্যাপে যাঁরা গাড়ি চালান, তাঁদের অনেকেই সারা রাত ডিউটি করে কিংবা যাত্রীর অপেক্ষায় গাড়ির মধ্যেই হয়তো ঘুমিয়ে ছিলেন।সকালে তাঁদের কেউ কেউ গাড়ি পরিষ্কার করতে ব্যস্ত। চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ, মনে নানা দুশ্চিন্তা। হয়তো তাঁরা ভাবছেন, আজ যদি কয়েকটি ট্রিপ না পান, তাহলে আকাশছোঁয়া জিনিসপত্রের দাম সামলে সংসার চালাবেন কী করে!
অন্যদিকে, দিল্লি কর্পোরেশনের অধীনে বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে চুক্তিভিত্তিক পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা রাস্তা ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করছেন। প্রাতর্ভ্রমণকারীদের কেউ তাঁদের পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছেন, কেউ আবার রুমাল দিয়ে মুখ ঢেকে হেঁটে চলেছেন। যাঁরা শহরকে পরিচ্ছন্ন রাখার কাজে ব্যস্ত, তাঁদের পরিশ্রমের ওপর নির্ভর করেই তো আমাদের সকালের পথচলা অনেকটা স্বস্তিদায়ক হয়ে ওঠে।
আবার কিছু মহিলা- কেও কেও পায়ে হেটে, কেও ই-রিকসা করে , কেও আবার স্কুটিতে করে বাবুদের বাড়িতে রান্নাবান্না করতে ছুটছে ।  
একদল মানুষ পার্কে হাঁটছেন, কেউ কেউ ব্যায়াম করছেন, আবার কেউ প্রাণায়াম করছেন। মন্দিরে সকালের পূজার আয়োজন চলছে, আর ধ্বনিত হচ্ছে নানা ধরনের ভক্তিগীতি। অন্যদিকে, মহল্লার মসজিদে ফজরের নামাজ শেষ করে ইমাম সাহেব ও মুসল্লিরা প্রতিদিনের মতো আজও ধীরে ধীরে নিজেদের ঘরের পথে ফিরে যাচ্ছেন।
গাড়িগুলো ক্রমশ রাস্তায় নামতে শুরু করেছে। বাইকগুলোও দ্রুত ছুটে চলেছে। কেউ নিজের কাজে যাচ্ছেন, আবার কেউ কাউকে মেট্রো স্টেশন কিংবা স্কুলে পৌঁছে দিচ্ছেন।
বড় বড় দোকান ও শপিং মলের দরজা তখনও বন্ধ।অন্যদিকে, ঠেলাগাড়িতে সবজি, কলা ও অন্যান্য ফল বিক্রি করেন যাঁরা, তাঁরাও নিজেদের পসরা সাজিয়ে বিক্রির জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন।
নগরসভ্যতার এক পরিচিত অথচ বেদনাদায়ক দৃশ্য চোখে পড়ল—রাস্তার পাশে স্তূপীকৃত আবর্জনার বিশাল পাহাড়। সেই আবর্জনার স্তূপে খালি হাতে তন্নতন্ন করে কিছু একটা খুঁজে চলেছেন কয়েকজন অসহায়, দরিদ্র মানুষ। তাঁদের চোখে একটুকরো আশার আলো—যদি কিছু পাওয়া যায়! হয়তো এমন কিছু, যা বিক্রি করে কিংবা কাজে লাগিয়ে দিনের রোজগারে সামান্য হলেও সাহায্য হবে। তাঁদেরই পাশে কয়েকটি কাক, কিছু পাখি আর রাস্তার কয়েকটি কুকুর নিজেদের প্রয়োজনীয় খাদ্যের সন্ধানে আবর্জনার স্তূপে ঠোকর মারছে, এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে।
দৃশ্যটা দেখতে দেখতে মনে হয়, ক্ষুধার কাছে মানুষ আর পশুপাখির মধ্যে কোনও ভেদাভেদ নেই। পেটের দায় সবারই সমান, বেঁচে থাকার তাগিদও এক।
এই পৃথিবীতেই একদল বিত্তশালী মানুষ তাঁদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার অনায়াসে রাস্তার পাশে কিংবা ডাস্টবিনে ফেলে দেন। অথচ সেই উচ্ছিষ্ট খাবারের ওপর নির্ভর করেই কংক্রিটের বিশাল বিশাল অট্টালিকার ছায়ায় কিছু মানুষ ও পশুপাখি বেঁচে থাকার নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যায়।এই ক্ষেত্রে ভূপেন হাজারিকার সেই বিখ্যাত গান, মানুষ মানুষের জন্য, তা বড়ই বেমানান।
একদিকে প্রাচুর্যের অহংকার, অন্যদিকে অভাবের অসহায়তা—একই পৃথিবীর বুকে পাশাপাশি বয়ে চলে জীবনের দুই বিপরীত স্রোত। কেউ খাবারের অপচয় করেন, কেউ আবার সেই ফেলে দেওয়া খাবারের সামান্য অংশটুকু  দিয়ে ক্ষুধার মতো জ্বালা নিবারণের আশায় আবর্জনার স্তূপে হাতড়ে বেড়ান।
আবর্জনার স্তূপ কত রকমের বিষাক্ত জীবাণু ও ক্ষতিকর পদার্থের আশ্রয়স্থল হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। সেখান থেকে সংক্রমণ ছড়িয়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ার ঝুঁকিও রয়েছে। অথচ যাঁরা সেখানে খাবার কিংবা বিক্রিযোগ্য জিনিসের সন্ধান করেন, তাঁরা এসব বিপদের কথা জানলেও অনেক সময় নিজেদের সরিয়ে নিতে পারেন না। কারণ, তাঁদের সামনে বিকল্প খুবই সীমিত। জীবিকার তাগিদ তাঁদের বাধ্য করে প্রতিদিন সেই ঝুঁকির মুখোমুখি হতে, জীবন বড় বালাই।
কেউ হয়তো অসুস্থ হয়ে পড়েন, কেউ দীর্ঘদিনের রোগভোগে দুর্বল হয়ে যান, আবার কারও জীবনও অকালে থেমে যেতে পারে। তবু পরদিন সকালে অন্য কোনও উপায় না থাকলে তাঁরা আবার সেই আবর্জনার স্তূপের কাছেই ফিরে আসেন। কারণ, জীবন যতক্ষণ আছে, বেঁচে থাকার সংগ্রামও ততক্ষণ চলবে। এই সংগ্রাম তাঁদের পছন্দের নয়; পরিস্থিতিই তাঁদের এমন জীবনের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
আরও কিছুটা এগিয়ে যেতে চোখে পড়ল কয়েকজন নারী-পুরুষকে। সারারাত ফুটপাতে শুয়ে কাটানোর পর তাঁরা ধীরে ধীরে উঠে বসছেন।কেউ নিজের বিছানাপত্র গুছিয়ে নিচ্ছেন, কেউ আবার ছেঁড়া চাদর কিংবা মলিন বালিশটি যত্ন করে একপাশে সরিয়ে রাখছেন। তারপর শুরু হবে তাঁদের প্রতিদিনের বেঁচে থাকার লড়াই—দিনের আহার জোগাড় করার লড়াই, কোনওমতে মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু টিকিয়ে রাখার লড়াই। তাঁদের কাছে প্রতিটি সকাল নতুন কোনও স্বপ্নের সূচনা নয়, বরং অনিশ্চয়তায় ভরা আরেকটি দিনের সঙ্গে সংগ্রামের প্রস্তুতি, শুরু দারুন পেটের রসদ জোগাড়ের অদম্য লড়াই।
জীবনের এই বিচিত্র অথচ নির্মম ছবিগুলো দেখতে দেখতে আমিও শহরের রাস্তায় এক ঠিকানাবিহীন যাযাবরের মতো নীরবে হেঁটে আপন মনে চলেছি।আমিও তো এই বিশাল পৃথিবীরই এক ক্ষুদ্র অংশ, এই নগরজীবনের এক নীরব পথিক। আমার চারপাশে কত মানুষ, কত জীবন, কত না-বলা কাহিনি ছড়িয়ে রয়েছে!কেউ ছুটছেন জীবনের সাফল্যের শিখরে পৌঁছানোর আশায়, কেউ আবার কেবল দুমুঠো অন্নের সংস্থান করতে দিনভর সংগ্রাম করে চলেছেন। কারও কাছে জীবন বিলাসের নাম, কারও কাছে জীবন মানে শুধুই টিকে থাকার এক কঠিন পরীক্ষা।
 হাঁটতে হাঁটতে একসময় এসে পৌঁছলাম একটি চৌমাথায়। সেখানে একটি বড় গাছের তলায়, বাড়ির সামনের বারান্দায় বসে রয়েছেন বেশ বেশ কিছু লোকজন। তাঁদের সামনে ছড়িয়ে রয়েছে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ম্যাগাজিন। কেউ সেগুলো গুছিয়ে নিচ্ছেন, কেউ আবার আলাদা আলাদা করে সাজিয়ে রাখছেন, যাতে পরে নির্দিষ্ট পাঠকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিলি করা যায়।
তাঁদের ব্যস্ততা দেখে মনে হলো, শহরের প্রতিটি সকালই যেন কত মানুষের অদৃশ্য পরিশ্রমের ওপর ভর করে ধীরে ধীরে জেগে ওঠে। কেউ সংবাদপত্র পড়ে দিনের খবর জানবেন, কেউ নিজের বিজ্ঞাপন, কেউ নিজের কোম্পানির বিজ্ঞাপন, কেউ বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে পাত্র-পাত্রীর খোঁজ ইত্যাদি কত রকমের বিষয় করেন, আবার কেউ কর্মসংস্থানের খবরের প্রত্যাশায় থাকেন।আর কেউ সেই সংবাদপত্র পৌঁছে দিতে সকাল থেকেই পথে নেমে পড়েছেন।
আমিও বেশ খানিকটা পথ একা একা হেঁটে এসেছি। হাঁটতে হাঁটতে শরীরটা কিছুটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তাই ভাবলাম, ওই মানুষগুলোর পাশে গিয়ে একটু বসা যাক। চোখে পড়ল, সেখানে একটি লম্বা টেবিল পাতা রয়েছে।টেবিলের চারপাশে বসে কয়েকজন মানুষ পত্রপত্রিকার বান্ডিল তৈরি করতে ব্যস্ত।
আমি ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে তাঁদের পাশে একটি জায়গায় বসলাম। চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম, কেউই বিশেষ কথা বলছেন না।অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তার যেন কোনও অবকাশ নেই সেখানে। প্রত্যেকেই নিজের কাজে মগ্ন। কারও হাতে খবরের কাগজের স্তূপ, কেউ সেগুলো গুনে গুনে আলাদা করছেন, আবার কেউ একেকটি বান্ডিল সুন্দর করে গুছিয়ে রাখছেন। তাঁদের এই নীরব কর্মব্যস্ততার মধ্যে এক অদ্ভুত ছন্দ রয়েছে—যেন প্রত্যেকেই জানেন, কোন কাজটি কখন শেষ করতে হবে।
মানুষগুলোর দিকে একটু ভালো করে তাকালাম। তাঁদের মধ্যে যেমন রয়েছেন বেশ কয়েকজন বয়স্ক মানুষ, তেমনই আছেন কমবয়সি যুবকেরাও।বয়সের ব্যবধান থাকলেও তাঁদের কাজের মধ্যে কোনও পার্থক্য চোখে পড়ল না।প্রত্যেকেই নিজের দায়িত্বটুকু নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে চলেছেন। কারও মুখে বিশেষ কোনও অভিব্যক্তি নেই, নেই কাজের ফাঁকে গল্পগুজবের আয়োজন।যেন সময়ের সঙ্গে এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতায় নেমেছেন তাঁরা। ঠিক সময়মতো পাঠকের দরজায় পত্র-পত্রিকা পৌঁছে দিতে পারলেই মাসের শেষে পাওনাটা পাওয়া যাবে, যা সংসারের ঘানি টানার অন্যতম মাধ্যম। কোনও রকম খামখেয়ালিপনা বা দেরি হলে পাঠক অসন্তুষ্ট হতে পারেন, ফলে পত্রিকার গ্রাহকসংখ্যা কমে যেতে পারে। আর গ্রাহক কমে গেলে রোজগারও কিছুটা কমে যাবে, যা জীবনপথে চলার লড়াইকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। তাই সঠিক সময়ে কাজ করতে হবে, দেরি করার কোনও অবকাশ নেই।
সময় যে দ্রুত বয়ে যাচ্ছে, তা তাঁদের কাজের ব্যস্ততা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পত্রপত্রিকাগুলো গুছিয়ে নিয়ে বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিতে হবে। তারপর যে যার মতো ঘরে ফিরবেন। হয়তো দুপুরের খাবার খাবেন, কিংবা অপেক্ষা করবেন জীবনের পরবর্তী কাজের জন্য।
তাঁদের কাছে সময় নষ্ট করার অর্থই যেন দিনের কাজের ছন্দে ব্যাঘাত ঘটানো। আমি চুপচাপ বসে এই দৃশ্য দেখছিলাম। কত বিচিত্র মানুষের কত বিচিত্র জীবন! প্রত্যেকের জীবনেই রয়েছে নিজস্ব ব্যস্ততা, দায়িত্ব আর বেঁচে থাকার তাগিদ।
একটু আগেই দেখেছি, আবর্জনার স্তূপে খাবারের সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন কিছু অসহায় মানুষ। আর এখন দেখছি, সকালের আলো ফুটতেই কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন এই মানুষগুলো। জীবনের প্রয়োজনে প্রত্যেকেই ছুটে চলেছেন, শুধু ছুটে চলার পথগুলো আলাদা।
তাঁদের দিকে তাকিয়ে মনে পড়ে গেল কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘রানার’ কবিতার কথা। মনে হলো, এঁরাও যেন একেকজন রানার। তবে এঁদের হাতে চিঠির বোঝা নয়, খবরের কাগজের বান্ডিল। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটে চলতে হবে, বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিতে হবে সকালের খবর।
এই ছুটে চলার আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে জীবিকার তাগিদ, সংসারের দায়িত্ব আর বেঁচে থাকার নিরন্তর সংগ্রাম। ভাবছিলাম, মানুষের জীবনও যেন এক অন্তহীন দৌড়। কেউ ছুটছেন খবর পৌঁছে দিতে, কেউ খাবারের সন্ধানে, কেউবা সংসারের দায়ভার কাঁধে নিয়ে। ছুটে চলার কারণ আলাদা, পথও আলাদা—তবু প্রত্যেকেরই লক্ষ্য এক, জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
এসব ভাবতে ভাবতেই মনে হলো, এঁদের মধ্যে কারও সঙ্গে একটু আলাপ করা যায় না? হয়তো সামান্য দু-চারটি কথার মধ্যেই জানতে পারব এমন কোনও গল্প, যা বাইরে থেকে দেখলে কখনও বোঝা যায় না। কে জানে, এই নীরব, কর্মব্যস্ত মানুষগুলোর মধ্যে কারও জীবনের গল্প হয়তো আমাকে ভাবাবে, হয়তো নতুন করে চিনতে শেখাবে এই সমাজকে, এই পৃথিবীকে, কিংবা মানুষকেই। আমি চারপাশে চোখ বুলিয়ে এমন একজনকে খুঁজতে লাগলাম, যাঁর সঙ্গে সহজেই কথার সূত্রপাত করা যায়।
টেবিলের পাশ থেকে উঠে দাঁড়ালেন এক অত্যন্ত বয়স্ক ব্যক্তি। এতক্ষণ তিনি পত্রপত্রিকাগুলো গুছিয়ে রাখছিলেন। আমি তাঁকে ‘নমস্তেজি’ বলে সম্ভাষণ জানাতেই তিনিও প্রত্যুত্তরে ‘নমস্তেজি’ বলে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কেয়া বাবুজি, পত্রিকা চাহিয়ে?’
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস হবে?’
‘হাঁ, জি, লিজিয়ে।’
পত্রিকাটি আমার হাতে দিয়ে তিনি বললেন, ‘সাত রুপয়ে দাম।’
দাম মিটিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলাম। জানতে পারলাম, আজকাল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর চাহিদা বেশ বেড়েছে। তিনি বললেন, ‘এসআইআর কি খবর ইসমেঁ আচ্ছা সে লিখা হ্যায়। পহলে তো বিস-পচ্চিস কপি চলতা থা, অভি তো সাঠ-পঁয়ষঠ হো গয়া।’ অর্থাৎ, এসআইআর নিয়ে খবর প্রকাশিত হওয়ার পর পত্রিকাটির চাহিদা আগের তুলনায় অনেকটাই বেড়েছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আপনার নাম কী? আর আপনারা এখানে ক’টার সময় আসেন?’ তিনি বললেন, ‘রামচরণ লক্ষ্মণ শুক্লা, ‘বাবুজি, ভোর চারটে থেকেই আসতে হয়। কাজ তো অনেক!’ তারপর খানিকটা গর্বের সঙ্গেই বললেন, ‘ইধর আপ কিসিকো ভি পুছিয়ে, শুক্লাজি কহাঁ হ্যায়, বতা দেগা। সব লগ মুঝে জানতে হ্যায়, কিউঁকি মুঝসে পহলে কিসিনে ইয়ে কাম নহি কিয়া।’
তাঁর কথায় বোঝা গেল, এই এলাকায় তিনি একজন পরিচিত মানুষ। দীর্ঘদিন ধরে একই কাজ করতে করতে এখানকার মানুষের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। শুক্লাজি হিন্দিতে কথা বলছিলেন। তাঁর কথার সূত্র ধরে জানতে পারলাম, তাঁর জন্ম ১৯৫৬ সালে। মাত্র উনিশ বছর বয়স থেকে তিনি সংবাদপত্র বিলির কাজ করছেন।
একসময় যমুনার ওপারে তাঁর বাড়ি ছিল। কুড়ি বছর বয়সে তিনি একটি সরকারি স্কুলে শিক্ষকের চাকরি পেয়েছিলেন। কিন্তু কিছুদিন কাজ করার পরই সেই চাকরি ছেড়ে দেন। কেন? তিনি নিজেই জানালেন, তখন তাঁর মাসিক বেতন ছিল মাত্র ১৩০ টাকা। অথচ সংবাদপত্র বিক্রি করে তিনি মাসে ১৭০ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারতেন। তাই বেশি উপার্জনের আশায় শিক্ষকের চাকরি ছেড়ে সংবাদপত্র বিলির কাজকেই বেছে নিয়েছিলেন।
তাঁর বাবা অন্যের বাড়িতে কাজ করতেন। অনেক কষ্ট করে ছেলেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করিয়েছিলেন। বাবা তাঁকে চাকরি ছাড়তে নিষেধ করেছিলেন, বন্ধুরাও বুঝিয়েছিলেন। কিন্তু তখন তাঁর মনে হয়েছিল, শিক্ষকের চাকরিতে বেতন খুবই কম। তাই তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। কথা বলতে বলতে শুক্লাজি জানালেন, পরে তাঁর সঙ্গে যাঁরা শিক্ষকতার চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন, তাঁদের কেউ কেউ মাসে পঁচিশ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন পেয়েছেন।তাঁদের মধ্যে একজন তো প্রধান শিক্ষকও হয়েছিলেন। তাঁরা ভালো পেনশনও পান।
একটু থেমে তিনি বললেন, ‘তব সমঝ নেহি আয়া। সব উপরওয়ালে কি ইচ্ছা হ্যায়।’ কথাগুলো বলতে বলতে তাঁর মুখে একধরনের আক্ষেপ ফুটে উঠল। জীবনের একসময় যে সিদ্ধান্তকে তিনি সঠিক বলে মনে করেছিলেন, আজ ফিরে তাকালে সেই সিদ্ধান্তের পরিণতি হয়তো তাঁকে অন্যভাবে ভাবায়। যদি বাবার ও বন্ধুদের পরামর্শ শুনে সরকারি চাকরিটা না ছাড়তেন, তাহলে আজ হয়তো তাঁকে এতটা কষ্ট করতে হতো না। তবু তিনি নিজের জীবনকে মেনে নিয়েছেন। ভাগ্যের ওপর দোষ চাপিয়ে কিংবা অতীতকে আঁকড়ে ধরে বসে না থেকে কাজ করে চলেছেন আজও।
জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আঙ্কল, আপনার কত ছেলে-মেয়ে?’  বললেন, ‘বাবু, তিন মেয়ে আর দুই ছেলে। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। এক ছেলে অটো চালায়। আর ছোট ছেলে বি.এ. পাস করেও চাকরি পায়নি। সে আমার সঙ্গে সংবাদপত্র বিলি করার কাজে সাহায্য করে।’
কথা বলতে বলতে তিনি আরও জানালেন, একসময় এই গোটা এলাকাটি ছিল ধানখেত আর জলাভূমিতে ভরা। এখানে একটি বিশাল বটগাছ ছিল। শহর থেকে সংবাদপত্র এসে পৌঁছানোর পর সেই গাছের তলাতেই তাঁরা বসে পত্রিকাগুলো গুছিয়ে নিতেন। তারপর সেখান থেকে বাড়ি বাড়ি বিলি করতে বেরিয়ে পড়তেন। শুক্লাজির দাবি, শুধু এই এলাকাতেই নয়, আশপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলেও তিনিই সম্ভবত সবচেয়ে পুরোনো সংবাদপত্রের হকার।
শুরুতে অল্প কয়েকটি পত্রিকা বিলি হতো। প্রথমে যমুনার ওপারে কাজ করেছেন, তারপর ঘণ্টাঘর এলাকায়, আর শেষ পর্যন্ত এখানে এসে থিতু হয়েছেন। তাঁর স্মৃতির ঝুলি থেকে উঠে এল পুরোনো দিল্লির এক ভিন্ন ছবি। তিনি বললেন, ‘পহলে ইধর বহুত কম মকান থে। পক্কা মকান তো থা হি নহি। রাস্তা ভি মিট্টি কা থা।’ অর্থাৎ, আগে এই এলাকায় হাতে গোনা কয়েকটি বাড়ি ছিল। পাকা বাড়ি প্রায় ছিলই না। রাস্তাঘাটও ছিল মাটির।
সেই সময় তিনি পায়ে হেঁটেই বাড়ি বাড়ি সংবাদপত্র বিলি করতেন। পরে পত্রিকার সংখ্যা বাড়তে থাকায় সাইকেল ভাড়া করে কাজ করতে শুরু করেন। আর এখন অন্যদের মতো তাঁরও নিজস্ব সাইকেল রয়েছে। সেই সাইকেল নিয়েই প্রতিদিন সংবাদপত্র বিলি করতে বেরিয়ে পড়েন।
এত বছর ধরে এই পেশায় থাকার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জানালেন, সংবাদপত্রের হকারদের জীবনেও অনেক পরিবর্তন এসেছে। প্রতিদিনের পত্রিকার দাম প্রতিদিনই তাঁদের মালিককে মিটিয়ে দিতে হয়।কিন্তু গ্রাহকদের কাছ থেকে তাঁরা টাকা পান মাসের শেষে। ফলে ব্যবসা চালাতে গেলে নিয়মিত হিসাব রাখতে হয়, কখনও কখনও নিজের পকেট থেকেও টাকা জোগাড় করতে হয়।
বর্তমানে এই পেশায় লাভ অনেক কমে গেছে। অন্যদিকে, সংবাদপত্র বিলি করার কাজে মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। শিক্ষিত যুবকেরাও চাকরি না পেয়ে এই পেশায় আসছেন।
কথাগুলো বলতে বলতে শুক্লাজি একবার চারপাশে তাকালেন। ততক্ষণে অন্য হকারেরা যে যার মতো সংবাদপত্রের বান্ডিল নিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন। কেউ স্কুটিতে, কেউ মোটরসাইকেলে, আবার কেউ সাইকেলে চেপে ছুটছেন নিজের নিজের এলাকার দিকে। শুক্লাজিও তাড়াহুড়ো করে তাঁর পত্রিকাগুলো গুছিয়ে নিলেন। তারপর বললেন, ‘বাবু, আজ চলতা হুঁ। সময় নহি হ্যায়। পত্রিকা বিলি করকে বেটা কো এক দোকান পর কাম করনে জানা হ্যায়।’ এই বলে তিনি সাইকেল নিয়ে চলে গেলেন।
আমি চুপচাপ বসে রইলাম। দেখতে দেখতে একে একে সবাই চলে গেলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই এলাকাটি প্রায় নিস্তব্ধ হয়ে পড়ল। চারপাশ ফাঁকা। যেখানে একটু আগেও এত মানুষের ব্যস্ততা, এত কর্মচাঞ্চল্য ছিল, সেখানে এখন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে কয়েকটি সংবাদপত্রের পাতা। এই কাগজগুলোর ওপর ভর করেই যেন কিছুক্ষণ আগে সকালের কর্মযজ্ঞ চলছিল।
আমি সেই কাগজগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলাম। একেকটি সংবাদপত্রের পাতায় লেখা রয়েছে পৃথিবীর নানা প্রান্তের খবর। কোথাও আনন্দের সংবাদ, কোথাও বেদনার কাহিনি। কোথাও যুদ্ধের বিবরণ, কোথাও রাজনৈতিক সংঘাত, কোথাও মানুষের সাফল্য, আবার কোথাও সাধারণ মানুষের অসহায়তার গল্প।
কত মানুষের জীবনকাহিনি ছাপা হয় এই কাগজের পাতায়! কত অজানা ঘটনা, কত দুঃখ, কত আনন্দ, কত স্বপ্ন আর কত দীর্ঘশ্বাস প্রতিদিন মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে যায় এই সংবাদপত্রের মাধ্যমে।
কিন্তু যাঁরা সেই সংবাদ মানুষের দরজায় পৌঁছে দেন, তাঁদের জীবনের খবর কে রাখে?যাঁরা প্রতিদিন ভোরের আলো ফোটার আগেই ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েন, যাঁদের পরিশ্রমে অসংখ্য মানুষ সকালে উঠে হাতে পান দিনের খবর, তাঁদের নিজেদের জীবনের গল্পই বা কে লেখে?
রামচরণ লক্ষ্মণ শুক্লার জীবনেও তো রয়েছে কত উত্থান-পতন, কত সিদ্ধান্ত, কত না-পাওয়া আর কত মেনে নেওয়ার কাহিনি। একসময় তিনি শিক্ষকতার চাকরি পেয়েছিলেন। কিন্তু তুলনামূলক বেশি আয়ের আশায় সেই চাকরি ছেড়ে সংবাদপত্র বিলির কাজ বেছে নিয়েছিলেন। তখন হয়তো মনে হয়েছিল, এটাই সঠিক সিদ্ধান্ত। পরবর্তী জীবনে অন্যদের উন্নতি দেখে সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁর মনে আক্ষেপ জেগেছে কি না, তা তাঁর কথায় কিছুটা বোঝা গেল।
তবে তাঁর জীবনকে শুধু একটি ভুল সিদ্ধান্তের গল্প হিসেবে দেখলে অন্যায় হবে। কয়েক দশক ধরে তিনি পরিশ্রম করে সংসার চালিয়েছেন, সন্তানদের বড় করেছেন, নিজের কর্মক্ষেত্রে পরিচিতি অর্জন করেছেন। তাঁর জীবন যেমন কিছু না-পাওয়ার কাহিনি, তেমনই দায়িত্ব পালন করে যাওয়ারও এক দীর্ঘ ইতিহাস।
মানুষের জীবনে সব সিদ্ধান্তের ফল যে প্রত্যাশামতো হয়, তা নয়। কখনও সামান্য আয়ের পার্থক্যও ভবিষ্যতের গতিপথ বদলে দেয়। কখনও কোনও সিদ্ধান্তের মূল্য বোঝা যায় বহু বছর পরে। আর কখনও মানুষ নিজের অতীতের দিকে তাকিয়ে ভাবে—সেদিন অন্য পথ বেছে নিলে হয়তো জীবনটা অন্য রকম হতে পারত। কিন্তু জীবন তো আর পিছিয়ে গিয়ে সিদ্ধান্ত বদলানোর সুযোগ দেয় না। যা ঘটে গেছে, তা নিয়েই মানুষকে সামনের পথ চলতে হয়।
যে সংবাদপত্রে প্রতিদিন হাজারো মানুষের খবর ছাপা হয়, সেই সংবাদপত্রের আড়ালে থেকে যান এমনই অসংখ্য মানুষ। তাঁরা নীরবে কাজ করে যান, অন্যের জীবনে খবর পৌঁছে দেন, অথচ তাঁদের নিজেদের জীবনের কথা অধিকাংশ মানুষেরই অজানা থেকে যায়।
হয়তো তাঁদের জীবনের গল্পও একেকটি সংবাদ। হয়তো তাঁদের অভিজ্ঞতার মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে আমাদের সমাজের বহু অজানা সত্য। কিন্তু সেই সত্যগুলো সংবাদপত্রের পাতায় সচরাচর জায়গা পায় না।
এভাবেই পৃথিবী এগিয়ে চলে। কেউ খবর লেখেন, কেউ খবর ছাপেন, কেউ খবর বিলি করেন, আর কেউ সেই খবর পড়ে নিজের জীবনের সঙ্গে পৃথিবীর ঘটনাগুলোর যোগসূত্র খুঁজে বেড়ান।
প্রতিদিন ভোর হয়, শহর জেগে ওঠে, মানুষ কাজে বেরিয়ে পড়ে। সংবাদপত্রের পাতায় নতুন দিনের নতুন খবর জমা হয়। আর সেই খবরের বোঝা কাঁধে নিয়ে কত মানুষ যে নীরবে ছুটে চলেন, তাঁদের জীবনের আনন্দ-বেদনার খবর হয়তো কোনও দিনই কেউ জানতে পারে না। তবু তাঁদের পথচলা থেমে থাকে না।
জীবনের প্রয়োজনে, সংসারের দায়িত্বে, বেঁচে থাকার তাগিদে তাঁরা প্রতিদিন এগিয়ে চলেন। নীরবে, নিঃশব্দে, কারও কোনও স্বীকৃতির অপেক্ষা না করেই। ফিরে আসার পথে আমার মনে হলো, এই শহরের প্রতিটি সকাল আসলে অসংখ্য মানুষের জীবনের সম্মিলিত গল্প। নিরাপত্তারক্ষী বিনয় যাদব, কলা বিক্রেতা, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, আবর্জনার স্তূপে খাবার খুঁজতে থাকা মানুষ, ফুটপাতে রাত কাটানো পরিবার কিংবা সংবাদপত্রের হকার রামচরণ লক্ষ্মণ শুক্লা—প্রত্যেকেই নিজের মতো করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছেন। তাঁদের কারও জীবন স্বচ্ছলতার, কারও জীবন অভাবের; কারও দিন কাটে দায়িত্বের ভারে, কারও দিন কাটে অনিশ্চয়তার মধ্যে।
তবু সূর্য প্রতিদিন ওঠে। শহর জেগে ওঠে। মানুষ আবার কাজে বেরিয়ে পড়ে।
কারও জীবনে আনন্দ আসে, কারও জীবনে জমে থাকে দীর্ঘশ্বাস। কেউ নিজের সিদ্ধান্তের সাফল্যে তৃপ্ত হন, কেউ অতীতের দিকে ফিরে তাকিয়ে আক্ষেপ করেন। কিন্তু সময় কারও জন্য থেমে থাকে না। জীবনও থেমে থাকে না।
হয়তো এভাবেই চলতে থাকবে পৃথিবী, চলতে থাকবে মানুষের জীবন। আর সেই চলার পথে অসংখ্য সাধারণ মানুষের অসাধারণ জীবনকাহিনি থেকে যাবে আড়ালে—অলিখিত, অনুচ্চারিত, অথচ জীবনের গভীর সত্যে পরিপূর্ণ।
 জীবন আসলে এমনই—কারও কাছে প্রাচুর্য, কারও কাছে সংগ্রাম; কারও কাছে প্রাপ্তির আনন্দ, কারও কাছে না-পাওয়ার দীর্ঘশ্বাস। তবু প্রত্যেকেই নিজের মতো করে বেঁচে থাকেন, নিজের মতো করে পথ চলেন। এটাই জীবন, জীবন যে রকম। এই ভবের দুনিয়ায় কেউ কষ্টে ভরা জীবন কাটান, আবার কেউ আনন্দে, হাসিমুখে জীবনযাপন করেন। আর কিছু মানুষ রয়েছেন, যাঁরা মানুষের জীবনকে সুন্দর করে গড়ে তোলার জন্য, পৃথিবীকে মানুষের বাসযোগ্য করে তোলার জন্য নিরন্তর চেষ্টা করে যাচ্ছেন। গানের কথায় বলতে হয়, 
“আমি সেই দেশ খুঁজেছি কত, যেখানে বাঁচবে সবাই, বাসবে রাজার মতো।”
   

(Tripurainfo)

more articles...