ব্যক্তিগত ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো নতুন ফৌজদারি ও আইটি আইনে কঠোর শাস্তির বিধান আছে
জয়ন্ত দেবনাথ
June 22, 2026
ত্রিপুরায় সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা আবারও নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার, সামাজিক মাধ্যমে ব্যক্তিগত ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া, দলবল নিয়ে বেআইনিভাবে বাড়িতে প্রবেশ করে হামলা, সম্পত্তির ক্ষতি এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের নতুন তিনটি ফৌজদারি আইন- ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS), ২০২৩, ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (BNSS), ২০২৩ এবং ভারতীয় সাক্ষ্য অধিনিয়ম (BSA), ২০২৩, কার্যকর হওয়ার পর কোনও ব্যক্তি বা সংগঠন অন্য কোনও প্রাপ্ত বয়স্ক নারী বা পুরুষের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বিচার করার অধিকার নেই।
কোনও প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ যদি পারস্পরিক সম্মতিতে কোনও বাড়ি, হোস্টেল, গেস্ট হাউস, হোটেল, পার্ক, বৈধ স্পা সেন্টার বা অন্য কোনও ব্যক্তিগত স্থানে অবস্থান করেন, বা রাতে এক সাথে থাকেন তাহলে তা তাদের ব্যক্তিগত বিষয়। বিয়ের পর ডিভোর্স দিয়ে যেমন দ্বিতীয়বার বিয়ে করা বৈধ এক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ বিয়ে না করেও সহমতের ভিত্তিতে একসাথে থাকতে পারেন। শুধুমাত্র সন্দেহ বা গুজবের ভিত্তিতে সেখানে জোরপূর্বক প্রবেশ, হামলা, ভাঙচুর, ভিডিও ধারণ বা সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
সম্প্রতি আগরতলার বাধারঘাট এলাকায় কাবেরী সিনহা নামে রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তরের এক বিবাহবিচ্ছিন্না মহিলা কর্মচারীর বাসভবনে কিছু লোক প্রবেশ করে ভাঙচুর ও তাকে, তার বৃদ্ধা মা-কে, মামা সহ তিন ভাই- এর উপর আক্রমণ ও হেনস্থা করার অভিযোগ উঠেছে।
অন্যদিকে, তেলিয়ামুড়ার ঘামাইবাড়ি এলাকায় বনদপ্তরের এক কর্মচারীর সরকারি আবাসনে রাতের বেলায় কিছু ব্যক্তি প্রবেশ করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে এই বলে যে সেখানে অবৈধ যৌন কার্যকলাপ হয়ে থাকে। অভিযোগ, দুটি ক্ষেত্রেই স্থানীয় কিছু শাসক দলের সমর্থক পুলিশ সাথে নিয়ে গিয়ে অসদাচরণ করেছেন পুলিশের সামনেই। এই অভিযোগও রয়েছে যে, উভয় ক্ষেত্রেই উপস্থিত ব্যক্তিরা ছবি ও ভিডিও ধারণ করে পরে ইউটিউব, ফেসবুক সহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে তা ছড়িয়ে দেওয়া হয়। পরে কয়েকজন কন্টেন্ট ক্রিযেটরের হাত ধরে সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।
ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ২০১৭ সালে ঐতিহাসিক পুট্টাস্বামী মামলায় রায় দিয়ে ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। অতি সম্প্রতিও একাধিক মামলাতে সুপ্রিম কোর্ট অনুরূপ রায় দিয়েছেন।
অতএব, কোনও ব্যক্তি সম্পর্কে নৈতিক বা ব্যক্তিগত অভিযোগ থাকলেও সাধারণ মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারে না।
বি এন এস- এর একাধিক ধারা অনুযায়ী এসব অপরাধে মামলা হতে পারে।
ঘটনার প্রকৃতি অনুযায়ী পুলিশ বেআইনি ভাবে বাড়িতে প্রবেশ (Criminal Trespass), গৃহ অনধিকার প্রবেশ (House Trespass), সম্পত্তি ভাঙচুর ও ক্ষতিসাধন, মারধর বা শারীরিক আক্রমণ, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হুমকি, বেআইনি জমায়েত ও দাঙ্গা, মানহানি, নারীর মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করা, স্টকিং ও হয়রানি, জনশৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে নিজের থেকেই মামলা নিতে পারেন। এই ধরনের অপরাধের জন্য জরিমানা, কারাদণ্ড অথবা উভয় শাস্তিই হতে পারে।
গোপনে ছবি বা ভিডিও ধারণ করা শাস্তি যোগ্য অপরাধ। অর্থাৎ কোনও ব্যক্তির সম্মতি ছাড়া তার ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি বা ভিডিও ধারণ করা এবং তা অন্যের কাছে পাঠানো বা সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করা গুরুতর অপরাধ।
বিশেষ করে কোনও মহিলার ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও তার অনুমোদন ছাড়া ধারণ, সংরক্ষণ বা প্রচার করলে কঠোর ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
তথ্যপ্রযুক্তি (IT) আইনের বিধান অনুযায়ীও ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও অনুমতি ছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপলোড করা, হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপ বা অন্য কোনও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করা অপরাধ।এসব অপরাধের জন্য ফৌজদারি মামলা হতে পারে।
ভিডিও ধারণকারী ব্যক্তি ছাড়াও যারা জেনে শুনে সেই ভিডিও শেয়ার বা ভাইরাল করেন, তারাও আইনের আওতায় আসতে পারেন।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ঘটনায় পুলিশের দায়িত্ব হলো,
অবিলম্বে বেআইনি জমায়েত ছত্রভঙ্গ করা।
আক্রান্ত নারী-পুরুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
বাড়িতে অনধিকার প্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে মামলা নেওয়া।
ভাঙচুরকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।
বেআইনি ভিডিও ধারণে ব্যবহৃত মোবাইল বা ডিভাইস জব্দ করা।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো ভিডিও অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া।
অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় না দেখে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
ভুক্তভোগীদের আইনি সুরক্ষা প্রদান করা। কেননা, কোন আইনেই আইন নিজের হাতে নেওয়ার অধিকার কারও নেই। তাই ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী অধ্যাপক (ডা) মানিক সাহা নিজেও বলে থাকেন কেউ যেন আইন হাতে তুলে না নেন। আর এধরনের অপরাধ দমনে পুলিশকে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দিয়ে তিনি একাধিকবার বলেছেন, অপরাধীদের দমনে আইন আইনের পথে চলবে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, পরকীয়া, ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা নৈতিকতার প্রশ্নে কোনও ব্যক্তি, রাজনৈতিক কর্মী, সামাজিক সংগঠন বা স্থানীয় জনতা কাউকেই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অনুমতি দেয় না।
সুপ্রিম কোর্ট ইতিমধ্যেই পরকীয়াকে ফৌজদারি অপরাধের তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে। ফলে প্রাপ্ত বয়স্কদের পারস্পরিক সম্মতি ও সহমতের সম্পর্কের কারনে কারও বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর, মারধর বা ব্যক্তিগত ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
গণতান্ত্রিক সমাজে আইনের শাসনই শেষ কথা। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, মর্যাদা এবং মানবাধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধান দায়িত্ব। কিন্ত রাজ্যের বেশ কিছু জায়গাতে অতি সম্প্রতি আইনের শাসন ভুলুন্ঠিত হয়েছে এটা বলাই বাহুল্য।
(লেখক একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও ত্রিপুরাইনফো-র সম্পাদক)
(Tripurainfo)
more articles...