শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রয়াত ডিপি দত্ত : একজন দক্ষ প্রশাসক, সজ্জন মানুষ হিসাবে চির স্মরণীয় হয়ে থাকবেন

জয়ন্ত দেবনাথ

June 19, 2026   

শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রয়াত ডিপি দত্ত : একজন দক্ষ প্রশাসক, সজ্জন মানুষ হিসাবে চির স্মরণীয় হয়ে থাকবেন

ত্রিপুরার প্রশাসনিক অঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, প্রাক্তন টিসিএস অফিসার ও প্রাক্তন স্মল সেভিংস অধিকর্তা শ্রী দেবপ্রসাদ দত্ত (ডিপি দত্ত)-এর প্রয়াণে আমি গভীরভাবে শোকাহত। গত ১৮ জুন ২০২৬ তাঁর আগরতলাস্হিত  মহেশখলা, ডুকলি নিবাসে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর।
১৯৯০-এর দশকে দৈনিক সংবাদে সাংবাদিকতা জীবনের শুরু থেকেই তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়। সেই পরিচয় ক্রমে আত্মিক সম্পর্কে পরিণত হয়েছিল। তাঁর দুই পুত্রের মধ্যে তিলক দত্ত একজন শিক্ষক এবং সুব্রত দত্ত একজন সৎ ও নিষ্ঠাবান টিসিএস অফিসার। তাঁর ভাতিজা রাজীব দত্তও বর্তমানে আইএএস কর্মকর্তা হিসেবে বিদ্যালয় শিক্ষা দপ্তরের অধিকর্তার দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের পরিচয়ের সূত্রে একাধিকবার তাঁদের বাড়িতে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। গত বছর দুর্গা পুজোর আগে তাকে শেষ বারের মতো দেখতে গেছিলাম। 
ডিপি দত্ত আমাকে নিজের ছেলের বন্ধুর মতোই স্নেহ ও ভালোবাসা দিতেন। সাংবাদিকতার প্রয়োজনে যখনই কোনো তথ্য বা সরকারি বিষয় সম্পর্কে তাঁর কাছে গিয়েছি, তিনি সরকারি গোপনীয়তা রক্ষা করেই প্রয়োজনীয় তথ্য ও পরামর্শ দিয়ে আমাকে সহযোগিতা করেছেন। বিশেষ করে তিনি যখন স্মল সেভিংস দপ্তরের অধিকর্তা ছিলেন, তখন সাধারণ মানুষকে চিটফান্ডের প্রতারণা থেকে দূরে রেখে সরকারী সঞ্চয় প্রকল্পের প্রতি উৎসাহিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন সচেতনতামূলক সংবাদ প্রকাশে আমাকে উৎসাহিত করেছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, সংবাদমাধ্যম সমাজ পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী মাধ্যম।
ডিপি দত্ত ১৯৬২ সালে ইউপিএসসি পরিচালিত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কমলপুর রেভিনিউ সার্কেলের সার্কেল অফিসার হিসেবে প্রশাসনিক জীবনে যোগদান করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি ত্রিপুরার বিভিন্ন ব্লকের বিডিও, খোয়াই ও সদর মহকুমার এসডিএম হিসেবে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। বিশেষ করে উপজাতি অধ্যুষিত এলাকার উন্নয়ন এবং সাধারণ মানুষের কল্যাণে তাঁর অবদান আজও স্মরণীয়।
১৯৮০ সালের ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক অশান্তির সময় তিনি একজন বিচক্ষণ ও সাহসী প্রশাসক হিসেবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। চাকরির শেষ পর্যায়ে তিনি ত্রিপুরা সরকারের অর্থ, সাধারণ প্রশাসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য দপ্তরে যুগ্মসচিব হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।
চাকরির শেষ সময়ে স্মল সেভিংস বিভাগের অধিকর্তা হিসেবে তিনি রাজ্যের ক্ষুদ্র সঞ্চয় কর্মসূচিকে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করেন। তাঁর প্রশাসনিক দূরদর্শিতা ও সততা তাঁকে সহকর্মী, জনপ্রতিনিধি এবং সাধারণ মানুষের কাছে সমানভাবে শ্রদ্ধার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।
১৯৯৬ সালে অবসর গ্রহণের পরও তিনি সমাজসেবামূলক কাজে সক্রিয় ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ত্রিপুরার চতুর্থ বেতন কমিশনের সম্মানিত সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। অবসরজীবনেও তিনি সমাজ, প্রশাসন এবং নতুন প্রজন্মের অফিসার কর্মচারীদের জন্য ছিলেন এক প্রেরণার উৎস।
আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি, ডিপি দত্ত-এর মত নিরহংকার, সৎ, কর্মনিষ্ঠ ও মানবিক মানুষ ত্রিপুরার প্রশাসনে যত বেশী করে আসবে ত্রিপুরার প্রশাসনিক অঙ্গনে মানুষের জন্য কাজের পরিধি ও গতি  ততই বাড়বে। তাঁর মৃত্যুতে ত্রিপুরা শুধু একজন দক্ষ অভিজ্জ প্রশাসককেই হারায়নি, হারিয়েছে একজন অভিভাবকসুলভ ব্যক্তিত্বকে, যিনি নীরবে এবং নিষ্ঠার সঙ্গে জনসেবার আদর্শকে ধারণ করেছিলেন।
আমি তাঁর বিদেহী আত্মার চিরশান্তি কামনা করছি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।
ওঁ শান্তি।
-জয়ন্ত দেবনাথ
সম্পাদক, Tripurainfo.com
   (Tripurainfo)

more articles...