ত্রিপুরায় বৈশ্য কপালি জনগোষ্ঠী: ভূমি, শ্রম ও সহাবস্থানের এক নিরন্তর আখ্যান
অসীম সরকার
September 17, 2026
ত্রিপুরার ইতিহাসকে যদি কেবল রাজপ্রাসাদ আর রাজনৈতিক দলিলের ভেতর থেকে দেখা হয়, তবে তার আসল রূপটি অধরাই থেকে যাবে। ত্রিপুরার আসল ইতিহাস লেখা আছে তার টিলা আর লুঙ্গার মাঝে, তার হাট-বাজারের কোলাহলে আর তার মাঠের ফসলে। সেই ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে, পাহাড় আর সমতলের এই মিলনভূমিতে বহু জনগোষ্ঠী তাদের শ্রম আর ঘাম দিয়ে এই মাটিকে উর্বর করে তুলেছে। বৈশ্য কপালি সম্প্রদায় তেমনই একটি জনগোষ্ঠী, যাদের নাম সরকারি ফাইলে হয়তো খুব বেশি উজ্জ্বল নয়, কিন্তু যাদের পায়ের ছাপ এই রাজ্যের মাটিতে অত্যন্ত গভীর।
কে এই বৈশ্য কপালি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে বহু বছর আগে। কপালি শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে নানা মত আছে, তবে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মত হলো এই শব্দটি এসেছে কার্পাস বা তুলা থেকে। যারা তুলা নিয়ে কাজ করে, তুলা থেকে সুতা তৈরি করে, কাপড় বোনে, তারাই কপালি। এরা বর্ণে বৈশ্য। বৈশ্যের যে আদি ধর্ম বলা হয়েছে, কৃষি, গোরক্ষা ও বাণিজ্য, কপালি সমাজ আজও সেই ধর্মই বহন করে চলেছে। এদের আদি বাস ছিল পূর্ববঙ্গের ফরিদপুর, বরিশাল, ঢাকা ও কুমিল্লা অঞ্চলে। দেশভাগের যন্ত্রণা এবং পরবর্তীকালে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রাণ বাঁচাতে এরা দলে দলে ত্রিপুরায় এসে আশ্রয় নেয়। মহারাজাদের আমল থেকেই ত্রিপুরার সমতলে পাট ও ধান চাষের জন্য দক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজন ছিল, সেই প্রয়োজনের তাগিদেই এই জনগোষ্ঠী একসময় ত্রিপুরার মাটিতে স্থায়ীভাবে বসতি গড়ে তোলে।
আজ যদি আমরা ত্রিপুরার মানচিত্রের দিকে তাকাই, তবে দেখব রাজ্যের প্রায় আটষট্টি শতাংশ এলাকা জুড়ে বিস্তৃত টিটিএএডিসি। এই স্বশাসিত জেলা পরিষদ গঠিত হয়েছিল সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিল অনুযায়ী উপজাতিদের স্বার্থ রক্ষার জন্য, তাদের জমি, ভাষা ও সংস্কৃতিকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য। এটি একটি মহৎ উদ্দেশ্য এবং এই উদ্দেশ্যের প্রতি পূর্ণ সমর্থন থাকা উচিত। কিন্তু এই বৃহৎ ভূখণ্ডের ভেতরের জনবিন্যাসের দিকে তাকালে আরেকটি বাস্তবতা উঠে আসে। এই আটষট্টি শতাংশ ভূমির ভেতরেই রয়ে গেছে অসংখ্য বাঙালি গ্রাম, বাজার ও জনপদ। সরকারি হিসেবে ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী টিটিএএডিসি এলাকায় অ-উপজাতি জনসংখ্যা ছিল প্রায় এক লক্ষ চুরানব্বই হাজার, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ষোল শতাংশ। আজ দুই হাজার ছাব্বিশ সালে দাঁড়িয়ে রাজ্যের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই সংখ্যা তিন থেকে সাড়ে তিন লক্ষের বেশি হবে বলেই অনুমান করা হয়। অনেকের মতে এই সংখ্যা চার লক্ষের কাছাকাছি। এই মানুষগুলো হঠাৎ করে আসেনি, এরা গত ষাট-সত্তর বছর ধরে সেখানেই বাস করছে।
এই বিস্তীর্ণ অ-উপজাতি জনগোষ্ঠীর মধ্যেই বৈশ্য কপালিদের অবস্থান সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। আমার দীর্ঘদিনের ক্ষেত্র সমীক্ষা বলছে, টিটিএএডিসির ভেতরে বসবাসকারী অ-উপজাতি মানুষের প্রায় অর্ধেকই বৈশ্য কপালি সম্প্রদায়ভুক্ত। অর্থাৎ প্রায় আশি হাজার থেকে এক লক্ষ মানুষ আজও টিটিএএডিসি এলাকার ভেতরেই বসবাস করছে। এদের বসতি কোনো একটি নির্দিষ্ট জায়গায় সীমাবদ্ধ নয়, এরা ছড়িয়ে আছে গন্ডাছড়া থেকে কমলাসাগর পর্যন্ত।
গন্ডাছড়া ও রৈশ্যাবাড়ির মতো দুর্গম অঞ্চলের দিকে তাকালে দেখা যাবে, সেখানে ডুম্বুরনগর ব্লকের ভেতরে বহু কপালি পরিবার ষাটের দশক থেকেই জুম ও সমতল চাষের সঙ্গে যুক্ত। তারা অত্যন্ত লড়াকু একটি জনগোষ্ঠী, দাঙ্গা ও উচ্ছেদের যন্ত্রণা সহ্য করেও তারা গন্ডাছড়া বাজার, রৈশ্যাবাড়ি বাজারকে আজও সচল রেখেছে। সেখানকার ছোট ব্যবসার সিংহভাগই আজও এই বাঙালি ও কপালি সম্প্রদায়ের হাতে। আবার খোয়াই জেলার কল্যাণপুর, চম্পকনগর, চেবরি, তেলিয়ামুড়া, মুঙ্গিয়াকামী অঞ্চলে এলে দেখা যাবে এটি কপালিদের প্রাণকেন্দ্র। এখানে প্রতিটি বাড়িতে আজও তাঁত আছে, প্রতিটি উঠোনে পাট শুকানো হয়। তেলিয়ামুড়া বাজার, কল্যাণপুর বাজার, চম্পকনগর বাজারের সবজি ও কাপড়ের বাজার মূলত এদের হাতেই গড়ে উঠেছে। এদের অনেকের হাতেই উনিশশো পঁয়ষট্টি সালের খাজনার রশিদও আছে। সিপাহীজলা জেলার খাসিয়ামঙ্গল, কমলাসাগর, বক্সনগর, সোনামুড়া, বিশালগড় বেল্টের দিকে গেলে ছবিটা আরও স্পষ্ট হয়। এটি ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত ঘেঁষা এলাকা। এখানে কপালি পরিবারগুলো শুধু চাষী নয়, তারা যেন সীমান্তের প্রহরী। তারা না থাকলে এই সীমান্তবর্তী গ্রামগুলো ফাঁকা হয়ে যেত। কমলাসাগর ও বক্সনগরের যে বিশাল কাপড়ের হাট, তার মূল যোগানদার এই কপালি তাঁতীরাই। একইভাবে সাব্রুম, বিলোনিয়া, ঋষ্যমুখ, কাকড়াবন, অমরপুরের ওম্পি অঞ্চলেও ছোট ছোট পকেটে কপালি বসতি রয়েছে। ফলে টিটিএএডিসি মানে শুধু পাহাড় নয়, টিটিএএডিসি মানে গন্ডাছড়া থেকে কমলাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এক মিশ্র জনপদ, যেখানে উপজাতি ভাই তার রাবার বাগান করছে, আর ঠিক তার পাশের জমিতেই কপালি ভাই তার পাট ও ধান চাষ করছে। গন্ডাছড়া বাজারে উপজাতি মা তার বাঁশের ঝুড়ি বিক্রি করছে, আর কপালি মা তার হাতে বোনা গামছা বিক্রি করছে। এটাই ত্রিপুরার আসল বাস্তবতা।
এই বাস্তবতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে তাদের অস্তিত্বের সংকট। যে মানুষটি ষাট বছর ধরে একই ভিটায় বাস করছে, তার হাতে ভোটার কার্ড আছে, আধার কার্ড আছে, কিন্তু তার জমির মিউটেশন নেই। টিটিএএডিসি আইনে অ-উপজাতির জমি হস্তান্তরে কাউন্সিলের অনুমতি লাগে। ফলে সে না পারে জমি বিক্রি করতে, না পারে সেই জমি ব্যাংকে বন্ধক রেখে ছেলের পড়াশোনার জন্য একটি ঋণ নিতে। জমি আছে, কিন্তু জমির অধিকার নেই, এই যন্ত্রণা তাদের প্রতিদিন বয়ে বেড়াতে হয়। একইভাবে তাদের তাঁত শিল্প আজও ক্ষুদ্র কুটির শিল্পই রয়ে গেছে। কাঁচামালের জন্য, ট্রেড লাইসেন্সের জন্য তাদের খুমুলুং ও আগরতলা দুই জায়গায় দৌড়াতে হয়। ফলে তেলিয়ামুড়া বা কল্যাণপুরে একটি সুসংহত হ্যান্ডলুম ক্লাস্টার আজও গড়ে ওঠেনি। সবচেয়ে বড় সংকটটি হলো পরিচয়ের। টিটিএএডিসির ভেতরে বাস করেও তারা তপশিলি উপজাতির সংরক্ষণের আওতায় পড়ে না, আবার ওবিসির কেন্দ্রীয় তালিকায় কপালিদের নাম নিয়ে দীর্ঘদিনের জটিলতার কারণে তারা কেন্দ্রীয় সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হয়। ফলে একই গ্রামে একই স্কুলে পড়া দুটি ছেলের মধ্যে একজন সুযোগ পেয়ে যায়, আর কপালি পরিবারের মেধাবী ছেলেটি আশি শতাংশ নম্বর পেয়েও বেকারত্বের অন্ধকারে থেকে যায়।
এই অবস্থায় তাদের দাবি কী? তারা কি আলাদা কিছু চায়? না, তারা আলাদা রাজ্য চায় না, বিশেষ সুবিধা চায় না। তাদের দাবি অত্যন্ত মানবিক এবং ছোট। তারা চায় যে ভূমিতে তারা তিন পুরুষ ধরে ফসল ফলাচ্ছে, সেই ভূমির একটি মানবিক মিউটেশন। তারা চায় তাদের তাঁত শিল্পের জন্য একটি নির্দিষ্ট বাজার, যেখানে তেলিয়ামুড়া, বক্সনগর ও বিলোনিয়াকে কেন্দ্র করে তিনটি বড় পাইকারি বাজার গড়ে উঠবে, যেখানে উপজাতি ভাই তার রাবার ও বাঁশ বিক্রি করবে, আর কপালি ভাই তার পাট ও কাপড় বিক্রি করবে। বাজার মানে শুধু কেনাবেচা নয়, বাজার মানে মিলনক্ষেত্র। তারা চায় তাদের ছেলেমেয়েদের জন্য একটি হোস্টেল ও বৃত্তির ব্যবস্থা। তারা চায় হাসপাতাল হলে সেখানে কপালি মা-ও যাবে, উপজাতি মা-ও যাবে, স্কুল হলে সেখানে দুই সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েই একসঙ্গে পড়বে। এটাই তো থানসা বা ঐক্যের আসল ভিত্তি।
টিটিএএডিসির উন্নয়ন নিয়ে যখন আমরা কথা বলি, যখন হাসপাতাল, স্কুল, মডেল স্কুল, মেডিকেল কলেজের কথা বলি, তখন এই উন্নয়ন সবার জন্য হতে হবে। উপজাতিদের বিশেষ অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকুক, আরও মজবুত হোক, জমির সুরক্ষা থাকুক, সংরক্ষণ থাকুক, এ নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই, কারণ সংবিধান তাদের সেই অধিকার দিয়েছে এবং তারা এই মাটির আদি সন্তান। কিন্তু সেই অধিকার রক্ষা করতে গিয়ে যেন এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি না হয় যে, ষাট বছর ধরে একই গ্রামে বাস করা একটি কপালি পরিবার নিজের জমির মিউটেশনটুকু করতে পারছে না। উপজাতিদের অধিকার রক্ষার পাশাপাশি কপালিসহ অন্যান্য প্রাচীন বাঙালি বাসিন্দাদের অধিকারটিও যেন সযত্নে রক্ষা করা হয়। উৎখাত করে নয়, বুকে টেনে নিয়েই ত্রিপুরাকে এগোতে হবে। বৈশ্য কপালিদের অস্তিত্ব রক্ষা মানে কোনো একটি জাতিকে রক্ষা করা নয়, এর অর্থ হলো ত্রিপুরার শ্রমজীবী ঐতিহ্যকে রক্ষা করা।
(Tripurainfo)
more articles...